পটিয়া পৌর সদরের পোষ্ট অফিস এলাকায় শারমিন নামে এক মহিলার বাসায় পটিয়া আদালত মসজিদের ইমামের মাধ্যমে খালি ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে অনানুষ্ঠানিক বিয়ে করে একসাথে বসবাস শুরু করেছিলো তারা। কথা ছিলো প্রেমিকা আরজু পুলিশে চাকরি পেলে কাবিন নামা সম্পন্ন করবে। কিন্তু তার আগেই খুন হতে হলো প্রেমিক আরাফাত হোসেন ইমনকে(২০)।
মেয়েকে জোর করে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর ঝাড়পুঁক করতে মাজারে নিয়ে যাওয়ার পর প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যেতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলার ছত্তার হাট এলাকায় আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা গাড়ি থেকে নামিয়ে পিটিয়ে জখম ও ছুরিকাঘাত করে ইমনকে।
সারা জীবন একসাথে থাকার কথা বলেছিলে, এখন আমি কাকে নিয়ে থাকব- প্রেমিকার আহাজারি
হামলায় আহত হয়েছে ইমনের প্রেমিকাও। গত মঙ্গলবার দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার ছত্তারহাট এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (২ মার্চ) সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ইমন পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের পাইরোল গ্রামের এমদাদ হোসেন খোকনের ছেলে। সে পাইরোল গ্রামে পরিবারের সঙ্গে নানাবাড়িতে থাকতো।

হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমনের প্রেমিকা আরজু জানান, ‘তাদের হাতে পায়ে ধরেছি, প্রয়োজনে আমাদের পুলিশকে দিতে বলেছি। কিন্তু আমার কোন কথা তারা শোনে নি। প্রাণ বাঁচাতে মানুষের ঘরে ঢুকে লুকানোর চেষ্টা করেছি। সেখান থেকে বের করেও ওরা আমাদের কুকুরের মতো মেরেছে। ইমনের মাথায় একের পর এক রড-কাঠের আঘাতে রক্তাক্ত করেছে। রক্তাক্ত ইমনকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছি। শেষ রক্ষা করতে পারিনি। যুদ্ধ করেও তাকে বাঁচাতে পারিনি। এ ঘটনার জন্য আমার মা দায়ী।
জানা গেছে, আরাফাত হোসেন ইমনের সঙ্গে পটিয়া উপজেলার আশিয়া বাংলাবাজার এলাকার কলেজ পড়ুয়া কিশোরী আরজু মনির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একবছর আগে আরজু পটিয়ায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির কথা বলে পটিয়া পৌর সদরের পোস্ট অফিস এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করে। সেখানে শারমিন নামের একজনের সন্তানকে প্রাইভেট পড়াতেন আরজু। শারমিন এবং তার আরো দুই বোন একই এলাকায় বসবাস করলেও তারা রোহিঙ্গা বলে জানায় আরজু। শারমিন নামের মহিলাটি ইমন ও আরজুর বিয়ে করিয়ে দেয়ার কথা বলে ইমনের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনটি জন্মনিবন্ধন করায়। জন্মনিবন্ধন করানোর পর আদালত মসজিদের ইমামের মাধ্যমে কাবিন ছাড়া শুধু খালি ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে আরো তিনজন মেয়ের সাথে সাথে আরজু-ইমনেরও বিয়ে দেয়।
বিয়ের কিছুদিন পর শারমিন মহিলাটি ইমনকে আরো একটি জন্ম নিবন্ধন করে দিতে বললে ইমন পারবে না বলে জানায়। এর রেশ ধরে শারমিন নামের মহিলাটি আরজুর বিয়ে এবং বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেয়। ঘটনাটি জানতে পেরে আরজুর
মা শাহীন আক্তার মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলে আরজু মায়ের সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং বাসা থেকে ইমনের পরিবারের কাছে চলে যান।
তবে আরজুর মা পটিয়া থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ এসে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান বাবুলসহ গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে আরজুকে তার অভিভাবকের হাতে তুলে দেয়। এদিকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর ওই কিশোরীকে তার মা সহ অভিভাবকরা মারধর ও শাসন করে। তার ব্যবহৃত মোবাইল নিয়ে নেয়। এ অবস্থায় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা দু’জন অস্থির হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার কিশোরীকে নিয়ে তার মা আনোয়ারা উপজেলার কানুশাহ এর মাজারে যান। সেখান থেকে ওই কিশোরী তার প্রেমিক ইমনকে ফোন করে। ইমন তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে হাজির হয় সেখানে। কৌশলে আরজু প্রেমিককে নিয়ে একটি ট্যাক্সিতে উঠে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় ওই কিশোরীর মা স্থানীয় লোকজনকে বিষয়টি জানালে তাঁরা ছত্তারহাট এলাকায় খবর দেয়। সেই এলাকা অতিক্রম করার সময় ইমনকে বহনকারী ট্যাক্সির গতিরোধ করে স্থানীয় ট্যাক্সির চালকসহ লোকজন। তাদের ট্যাক্সি থেকে জোর করে নামিয়ে ফেলতে চাইলে তারা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে দু’জনকেই বেদম মারধর করা হয়। খবর পেয়ে আনোয়ারা থানা পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখান থেকে ইমনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। এদিকে বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে রাত ৯ টায়। পাইরোল গ্রামে ইমনের জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সকালে নিহত ইমনের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, সন্তান হারানোর শোকে মা-বাবা ও স্বজনদের বিলাপ চলছে। এদিকে ইমনের প্রেমিকা আরজুও বাপের বাড়ি না গিয়ে ইমনের বাড়িতে অবস্থান করছে। সে কিছুক্ষণ পরপর মূর্ছা যাচ্ছে।
ইমনের বাবা এমদাদ হোসেন খোকন জানান, আমার ছেলেকে নির্মম ভাবে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের বিচার চাই। এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি আনোয়ারা থানায় অবস্থান করছেন বলে জানান।
আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ মীর্জা মোহাম্মদ হাসান এর সাথে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে মামলার পর হত্যাকারীদের ধরতে দ্রুত ব্যবস্থা নিব।
এদিকে খবর নিয়ে জানা গেছে ইমন নিহত হওয়ার পর আরজুর মা সহ তার পরিবারের লোকজন পলাতক রয়েছে।
