রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য আর গৌরবের স্মারক সিআরবি

শুকলাল দাশ

পাহাড় ঘেরা-নদী বেষ্ঠিত অপরূপ মোহনীয় সৌকর্যময় আমাদের চট্টগ্রাম।

কালে কালে চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছে ব্যস্তসমস্ত বন্দরনগরী। চারদিকে নাগরিক ব্যস্ততার-প্রয়োজনের নিরিখে গড়ে ওঠেছে নান অবকাঠামো-আবাসন স্থাপনা।

অপরকল্পিত উন্নয়ন আর দখলবাজিতে ধ্বংস হয়েছে চট্টগ্রামের পাহাড়, প্রকৃতি, সবুজ বন, উম্মুক্ত এলাকা। নির্বিচারে পাহাড় কেটে উঠেছে সুউচ্চ ভবন। বানানো হয়েছে সড়ক। পুকুর, দীঘি, জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। উম্মুক্ত স্থানগুলোকে দখলে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক স্থাপনা। সাগর, নদী পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রাম হারিয়েছে তার চির চেনা রূপ। ব্যাপক নগরায়ন এবং শিল্পায়নের সাথে বাড়ছে নগরীর জনসংখ্যা। প্রকৃতি বিনাশী কর্মকান্ডে কংক্রিটের জঞ্জাল মহানগরীর বাসিন্দাদের হাঁঁসফাঁস অবস্থা।

তবে এ ধ্বংসের মধ্যেও সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গৌরবের স্মারক সিআরবি। সেখানকার শতবর্ষী বৃক্ষ ঘেরা ছায়া-সুশীতল বাতাস ক্ষণিকের জন্য হলেও প্রাণ জুড়িয়ে দেয়।

বাটালি হিল থেকে কদমতলী, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম থেকে লালখান বাজার হয়ে টাইগার পাস পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে এখনও পাহাড়, টিলা উপত্যকা সবুজ বৃক্ষের সারি। পাখ-পাখালি আর জীববৈচিত্র্যে ভরা এক খন্ড সবুজ উদ্যান এই মহানগরীতে মায়াবি আবেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে।

সেখানকার প্রতিটি বৃক্ষ যেন এক একটি অক্সিজেন কারখানা। আর তাই সিআরবিকে বলা হয় চট্টগ্রামের ফুসফুস। বহু বছরের প্রকৃতির শান্ত সুসিগ্ধ নীরবতার অপূর্ব ছন্দ। নাগরিক পারিপাশ্বিক জীবনের টানাপড়েনের চট্টগ্রামের জনসমাজ ছুটে আসে সিআরবির এই ছায়া ঘেরা-নির্জন পরিবেশে দু’দ- সুস্থির নি:শ্বাস নিতে। মন ভরান প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় কর্পোরেট সংস্থা বাণিজ্যকরণের নিমিত্তে এই সিআরবির প্রকৃতি ধ্বংস করে হাসপাতালসহ নানা অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসার কর্মকা-ে চট্টগ্রামবাসী স্তম্ভিত-ক্ষুদ্ধও বটে।

নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকা-কে আরো লাভজনক হিসেবে গড়ে তোলার এ অপচেষ্টায় চট্টগ্রামের আপামর জনগন-সর্বস্তরের পেশাজীবী সমাজ আজ প্রতিবাদমুখর। তারা কথামালা-কবিতা-ছড়া-আবৃত্তির সরব প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। সিআরবি চত্বরে সবার একই উচ্চারন-‘সিআরবির প্রাকৃতিক আবহ নষ্ট হতে দেওয়া যাবেনা।’

সিআরবির ছায়াময়-মায়াময় নির্জন প্রকৃতির মাঝে এই আঞ্চলের মানুষের দুদ- নি:শ্বাস নেয়ার পরিবেশ থাকতেই হবে।

এক সময় সিআরবির মতো অনেক উম্মুক্ত প্রাঙ্গণ ছিলো এই নগরীতে। সার্কিট হাউসের সামনের খোলা মাঠে বিকেলে জমতো অগণিত মানুষের আড্ডা। হতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এখন সেখানে শিশুপার্কের নামে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক স্থাপনা। তার পাশেই আউটার স্টেডিয়ামকে ঘিরে উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হতো বিকেলে। আউটার স্টেডিয়ামে খেলতো কিশোর-যুবকেরা। সেখানে এখন সুইমিংপুল, আশপাশে দোকান পাট। পাহাড় টিলা হরেক বৃক্ষরাজি আর লেকে ঘেরা ফ’য়স লেকেও এখন বাণিজ্যিক স্থাপনা।

শত শত কিশোর-যুবকের খেলাধুলার প্রশিক্ষণ মাঠ হিসাবে পরিচিত ছিলো আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ। এখন সেখানে পার্কের নামে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পার্কটি খোলা হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অন্যমত স্থান ডিসি হিলও এখন বিধি-নিষেধের বেড়াজালে অবরুদ্ধ। নগরীর অন্যতম পর্যটন এলাকা বাটালি হিলের পাদদেশে নানা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এতে সেখানে বেশ কয়েক দফা পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।

দখলে সৌন্দর্য হারিয়েছে নগরীর সর্বোচ্চ ওই পাহাড়টি। সেটি আর আগের মতো পর্যটক টানে না। এভাবে নগরীর উম্মুক্ত স্থানগুলো হারিয়ে গেছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক, আবাসিক এলাকা। পাহাড় নিধনে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়েছে চট্টগ্রাম। নগরী হারিয়েছে তার সৌন্দর্য।

অবশিষ্ট আছে সিআরবি। ছায়া-সুনিবিড় সিআরবির এই উম্মুক্ত স্থানেও এখন শকুনের থাবা। সেখানকার প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে চলছে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ আর নার্সিং ইনস্টিটিউটের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি।

নিবিড় প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনের এই তীর্থক্ষেত্রটি চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও বিনোদনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে সর্বমহলে। এখানে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে-বাংলা নববর্ষ উৎসব, রবীন্দ্র-নজরুল স্মরণ উৎসবসহ আনন্দঘন নানান লোকজ ও সাংস্কৃতিক উৎসব। এসব অনুষ্ঠান গুলোতে বাঙালি খুঁজে পায়-তাদের শেকড়ের সন্ধান-ঐতিহ্যের গৌরবগাথা।

এতসবের পাশাপাশি সিআরবি ধারণ করে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। এই সিআরবি এলাকায় রয়েছে-আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের প্রথম নির্বাচিত জিএস শহীদ আব্দুর রবসহ আরো অনেক শহীদের কবর। তাদের স্মৃতিময় স্মৃতিসৌধ।

তাই ইতিহাস-ঐতিহ্যের এত সব অমূল্য স্থাপনা-নির্মল প্রকৃতি বিনষ্ট করে আমরা চাই না কোনো স্থাপনা-সিআরবিতে নির্মিত হোক। আমাদের অহঙ্কারের সিআরবি-চট্টগ্রামের ফুসফুস সিআরবির স্বকীয়তা বজায় থাকুক। আমাদের অক্সিজেনের অফুরান ভা-ার হয়ে চট্টগ্রামবাসীর কাছে চির ঐতিহ্যময় হয়ে বেঁচে থাকুক চিরদিন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ডিটেইলস এরিয়া প্ল্যানে পুরো সিআরবি এলাকাকে হেরিটেজ ও কালচার জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শতবছরের এই হেরিটেজ এলাকায় কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যায়না।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

বান্দরবানে পর্যটকবাহী নৌকাডুবি: বিজিবির তৎপরতায় ৬ জন জীবিত উদ্ধার, নিখোঁজ ১

বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড়পাথর এলাকায় সাঙ্গু নদীতে পর্যটকবাহী একটি...

হাটহাজারীতে পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল ৩ বছরের শিশুর

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পুকুরে ডুবে হুমাইরা (৩) নামে এক শিশুর...

চট্টগ্রাম বন্দরে নির্বাচনী তফশীল ঘোষণা, ভোট ২৯ আগস্ট

চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক-কভ্যার্ড ভ্যান মালিক ও কন্ট্রাক্টর এসোসিয়েশনের (রেজিস্ট্রেশন...

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ৩১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন অটোরিকশা/অটো টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং-১৪৪১) শ্রমিক...

চট্টগ্রামে বায়েজিদ শেরশাহ নালায় মিলল ১৩২০ পিস বুলেট

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকার একটি...

চট্টগ্রামের বায়েজিদে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিদেশি অস্ত্র-গুলি উদ্ধার

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায়...

আরও পড়ুন

দিদিয়ের দ্রগবা: ফুটবলের বাইরে যুদ্ধক্লান্ত মানুষের শান্তির রূপকার

আইভরি কোস্ট একসময় পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম স্টেবল স্টেট এবং "রিজিওনাল ইকোনমিক পাওয়ার" হিসেবে পরিচিত ছিল।ঔপনিবেশিক-পরবর্তী যুগে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ, তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং...

আল-কিন্দির চিন্তাজগৎ: কসমিক হারমনি থেকে সঙ্গীততত্ত্ব

আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবন ইসহাক আল-কিন্দি (আল-কিন্দি) নবম শতকের একজন বিশিষ্ট আরব ফিলোসফার, বিজ্ঞানচিন্তক, পলিম্যাথ ও ইন্টেলেকচুয়াল থিওরিস্ট ছিলেন।আনুমানিক ৮০১ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের ঐতিহাসিক...

বিআরটি প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সভা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।রবিবার (১৪ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে...

সাংবাদিক শিশির বড়ুয়া এবং প্রভাত বড়ুয়া আর নেই

চট্টগ্রামে চিত্র সাংবাদিকতায় আর্কাইভ খ্যাত সিনিয়র সাংবাদিক শিশির বড়ুয়া ও দৈনিক পূর্বকোণের সিনিয়র সম্পাদনা সহকারী প্রভাত বড়ুয়া মৃত্যুবরণ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ( ৪ জুন...