রাঙামাটি ধনপাতা বনবিহারে দুদিন ব্যাপী বিশ্বশান্তি মঙ্গল কামনায় ও জগতে সকল প্রাণী সুখী হোক শ্লোগানে-ত্রি স্মৃতি বিজড়িত শুভ বুদ্ধ পূর্নিমা যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে। এছাড়াও জেলার অন্যান্য বিহারেও শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপন করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৪ মে) পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বিলাইছড়ি উপজেলা শাখার পূর্ণিমা উদযাপন কমিটির আয়োজনে সকাল ৮ টায় একটি র্যালি বের করে বাজার হয়ে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহার দীঘলছড়িতে গিয়ে শেষ হয়।
একই ভাবে ধনপাতা বনবিহারেও দীঘিনালা বনবিহার হতে পরম পুজ্য সাধনা নন্দ মহাস্থবির বনভান্তের প্রধান শিষ্য ভারত বাংলা মিয়ানমার সহ বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ রত্ন উপাধি প্রাপ্ত নন্দ পাল মহাস্থবির ভান্তে ৪ও ৫ মে আগমন উপলক্ষে ধনপাতা বনবিহার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়। দুদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে দায়ক দায়িকার পক্ষে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাঙামাটির সাংসদ ও খাদ্য মন্ত্রনালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এম পি। এছাড়াও বিভিন্ন গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবে বলে ধনপাতা বনবিহার কার্যনির্বাহী পরিষদ ও বিহারাধক্ষ্য প্রজ্ঞা বোধি স্থবির ভান্তে সুত্রে জানা যায়। একই ভাবে বিলাইছড়ি বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে ৪মে পঞ্চশীল গ্রহণের মধ্যদিয়ে অষ্টশীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কার দান, সংঘদান ও ধর্মীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ধর্মীয় সভায় উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বিলাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি আর্য্যলঙ্কার মহাথেরসহ অন্যান্য ভিক্ষু সংঘ,উপাসক- উপাসিকা ও শতশত পূর্ণ্যার্থীবৃন্দ।
উল্লেখ্য, আজ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য অতি পবিত্রতম একটি দিন। এই দিনে অর্থাৎ বৈশাখী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধ নেপালের লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভারতের বুদ্ধগয়ায় বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন এবং কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ বা মহাপ্রয়াণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জন্ম, বোধিজ্ঞান লাভ ও মহাপরিনির্বাণ একই দিনে হওয়ায় ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য শ্রেষ্ঠতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বের সকল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে এটি বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে পরিচিত।
বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ একই দিনে অর্থাৎ এই পূর্নিমা তিথিকে বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্নিমা বলে থাকেন। ত্রি স্মৃতি বিজড়িত হয়েছিল বলে বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে আখ্যায়িত করা হয়। আজ থেকে ২৫৬৭ বছর পূর্বে বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধ আভির্ভূত হয়েছিলেন বা শুভ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
মহামতি গৌতম বুদ্ধ সারা বিশ্বের মানব জাতির দুঃখ-বেদনাকে নিজের দুঃখ বলে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই মানব জীবনের দুঃখ-কষ্ট, জন্ম, জরা, ব্যাধি মৃত্যু স্বচক্ষে দেখে এবং তা উপলব্দি করে তিনি অঢেল সম্পদ, ঐশ্বর্য, রাজকীয় মর্যাদা, বিত্ত বৈভব ও সংসার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু-এই চারটি চিরসত্যের কারণ উদঘাটন এবং মানব জাতির শান্তি ও মুক্তির পথ খুঁজতে নিজেকে গভীরভাবে নিমগ্ন রাখেন। এক সময় রাজপ্রাসাদের বিত্ত-বৈভব ও সুখ এবং স্বজনের মায়া ত্যাগ করে সম্বোধি বা বুদ্ধত্ব লাভের পন্থা অন্বেষণে তিনি বেরিয়ে পড়েন রাজপ্রাসাদ ছেড়ে অজানার পথে। দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনার পর মহামতি গৌতম বুদ্ধ বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
বিত্ত ও বৈভবের মধ্যে বড় হয়েও মহামতি বুদ্ধ উপলব্ধি করেছিলেন ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। তাই অহিংসা পরম ধর্ম এই নীতিকে ধারণ করে মহামতি গৌতম বুদ্ধ সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় আজীবন সাম্য ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করে গেছেন। শান্তি ও সম্প্রীতির মাধ্যমে আদর্শ সমাজ গঠনই ছিল তথাগত বুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য। জগতের দেব-মনুষ্য তথা সকলের বিমুক্তি লাভের পথ প্রদর্শন করেছেন। জগতে হিংসা-হানাহানি বাদ দিয়ে, লোভ-দ্বেষ-মোহ ত্যাগ করে, তৃঞ্চাকে ক্ষয় করে, জন্ম-জরা-ব্যাধি-মৃত্যুকে জয় করে, একমাত্র মুক্তির পথ নির্বাণ-কে আবিষ্কার করেছেন।
