পাহাড়ি জনপদ মানিকছড়ি। সবুজের বুক চিড়ে এগিয়ে চলেছে আকাবাকা পাহাড়ি পথ। যেদিকে চোখ যায় সবুজের সমারোহে মন জুড়িয়ে যায়। দুপাশে সবুজ পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে ছুঠে চলেছে দারুন এক মায়াবী পথ। চলতে চলতে এক জায়গায় গিয়ে থমকে দাড়াতে হয়।
কারন পাহাড়ের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে কেবলই গাছ আর গাছ। কি নেই গাছের মিছিলে। দেশী বিদেশী নানা প্রজাতির আম, মালটা, শরীফা আরো কত রকমের ফলজ গাছ। আর পাহাড়কে সবুজের চাউনি বানিয়েছে ফার্মার্স ভ্যালি। সারি সারি আম গাছে ঝুলছে নানা প্রজাতির আম। আ¤্রপালি, কাটিমন, বেনানা মেংগো, থাই প্রজাতির নানা রাজকীয় আম।
বাগানের উদ্যোক্তা ফাহিম উদ্দিন জানালেন তার স্বপ্নের বাগানের নানা কথা। প্রায় ১০০ কানি জায়গা জুড়ে গড়ে উঠা বাগানটি কেবলই কোন বানিজ্যিক লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়নি। মানুষের কাছে অর্গানিক ফল পৌছে দেওয়াটাই সবচাইতে বড় লক্ষ্য। বাগানের উদ্যোক্তা জানান তারা ফলে কোন ধরনের ঔষুধ ব্যবহার করেননা।

কৃষি গভেষনা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে একেবারে নিখাদ ভেজালমুক্ত খাটি ফল সংরক্ষন এবং সরবরাহ করে মানুষের কাছে। বাগানের একপাশ দিয়ে হাটা শুরু করলে আরেক প্রান্তে যেতে হাফিয়ে উঠতে হয়। যেতে যেতে দেখা মিলবে দীর্ঘ মাল্টা বাগান। মাল্টার চাহিদা আমাদের দেশে প্রচুর।
তিনি বলেন, আমরা সচরাচর আমদানী করা মাল্টা দিয়ে চাহিদা পুরন করি। তবে আমাদের দেশে গত এক দশক ধরে বেশ মাল্টা চাষ হচ্ছে। ফার্মার্স ভ্যালিতে দেখা মিলল নানা জাতের মাল্টা। পাহাড়জুড়ে সবুজ মাল্টা যেন ভরে গেছে।
এখানেও উদ্যোক্তা জানালেন তাদের হাইজেনিকের কথা। কোথাও কোন ধরনের কেমিক্যাল বা কীটনাশকের অস্তিত্ব নেই। যে কারনে বানিজ্যিকভাবে বাজারজাত করতে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।

যেহেতু কেবলই নিচক একটি ব্যবসা হিসেবে এই বাগানকে দেখছেনা উদ্যোক্তারা সেহেতু কেমিক্যালমুক্ত ফল মানুষের কাছে পৌছানোতেই যেন তাদের তৃপ্তি। নিজেদের পরিবার পরিজন, আতœীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবের জন্য যে ফলটি সরবরাহ করছে মালিক কতৃপক্ষ ক্রেতাদের কাছেও ঠিক সে জিনিসটিই পৌছে দিচ্ছে। ফার্মার্স ভ্যালিতে হাটতে হাটতে দেখা মিলল শরীফা ফলের।
এই ফলটি এখন একরকম বিলুপ্ত প্রায়। আর সে বিলুপ্ত ফলটিকে আবার চাষ করছে এ দেশের বাগানকারীরা। দেশি শরীফার পাশাপাশি এখন চাষ হচ্ছে থাই জাতের শরীফাও। সুস্বাদু এই ফলটি এখন পাওয়া যাচ্ছে আমাদের দেশে। ফার্মার্স ভ্যালি এই ফলটাকেও এখন মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ছোট গাছ কিন্তু ফলন বেশি যে কারণে শরীফা চাষ এখন বেশ জনপ্রিয় এদেশে।
পরিচিত ফলের পাশাপাশি রাম্বুটান কিংবা কাজু বাদাম বা তিন ফলেরও চাষ হচ্ছে ফার্মার্স ভ্যালিতে। যদিও সে সব সীমিত পরিসরে শুরু করেছে বাগান কতৃপক্ষ। কিন্তু এসব ফলের চাষও বেশ ভাল হচ্ছে। এতদিন নিজেরা বাইরে থেকে চারা এনে বাগান করলেও এবার নিজেরা নার্সারি করে ফলের পাশাপাশি গাছ উৎপাদনের দিকেও ঝুকছে। খুব সহসাই ফার্মার্স ভ্যালিতে যোগ হতে যাচ্ছে নার্সারী। যেখানে নানা জাতের ফলজ এবং ঔষুধী গাছের পাশাপাশি নানা জাতের মসলার গাছও উৎপাদন করা হবে। ফলে ফার্মার্স ভ্যালিতে নতুন একটি দিকের উম্মোচন হতে যাচ্ছে তেমনটি বলাই যায়।

ফার্মার্স ভ্যালি কতৃপক্ষ এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাদের বাগানের একটা অংশ একেবারেই অর্গানিক হিসেবে রাখা হবে। যেখানে দেওয়া হবেনা কোন ধরনের রাসায়নিক সার। কেবলই জৈব সার দিয়ে গাছ গুলোকে গড়ে তোলা হবে এবং ফলন পাওয়া যাবে। যদিও কাজটা একটু কষ্টসাধ্য, তারপরও ফার্মার্স ভ্যালি কতৃপক্ষ চাইছে একটি নতুন কিছু চালু করতে।
দেশের পার্বত্য অঞ্চল এখন যেন ফলফলাদির খনি। দেশি কিংবা বিদেশী, এমন কোন ফল নেই যা পাহাড়ে চাষ হচ্ছেনা। যে কারনে এক সময়ের ভয়ের জনপদ পাহাড় এখন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। শত শত বাগানে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল কর্মসংস্থান।
তবে কিছু কিছু বাগান মালিক নানা কেমিক্যাল ব্যবহার করে নিজের বাগানের ফলটাকে বিষাক্ত করে তুলছে। অধিক লাভের আশায় কেউ কেউ অপরিপুর্ন ফল পেরে বিক্রি করছে। যা খুবই দুঃখজনক।
তবে ফার্মার্স ভ্যালি কতৃপক্ষ জানিয়েছে তাদের ম্যাসেজ একেবারে পরিষ্কার। কোন ধরনের ক্ষতিকর কিছুর সংযোজন তাদের বাগানে নেই। কারন এই খাবার শিু থেকে শুরু করে ছেলে বুড়ো সবার জন্য। কাজেই সামান্য লাভের আশায় কারো কোন ক্ষতি করা তাদের উদ্দেশ্যে নেই। তাদের একটাই লক্ষ্য সেটা হচ্ছে পুষ্টিগুনে ভরা পরিপক্ষ এবং বিশুদ্ধ ফলটি মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া। ফার্মার্স ভ্যালি যে কবেল একটি বাগান তা কিন্তু না। এটা একটি দর্শনীয় স্থানও। পর্যটক আকর্ষনের বিশেষ পদক্ষেপও নিতে যাচ্ছে বাগান কতৃপক্ষ। তারা চাইছে তাদের বিশাল বাগান দেখতে আসতে পারবে পর্যটকরা।
পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে নির্মল বিনোদন আহরনের পাশাপাশি বাগান থেকে তাজা ফল নিয়ে ফিরতে পারবে বাড়িতে। সে পথে এরই মধ্যে হাটা শুরু করে দিয়েছে ফার্মার্স ভ্যালি কতৃপক্ষ। ভ্যালির উদ্যোক্তা ফাহিম উদ্দিন জানান, পাহাড় যেমন আল্লাহর নেয়ামত তেমনি পাহাড়ে জন্মানো ফল ফলাদিও আল্লাহর নেয়ামত। এই নেয়ামতকে বিষাক্ত করার কোন অধিকার কারো নেই। আল্লাহর নেয়ামতকে ঠিক নেয়ামতের মতই মানুষের কাছে পৌছাতে চায় ফার্মার্স ভ্যালি।
একেবারে সহজেই ফার্মার্স ভ্যালিতে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক ধরে মানিকছড়ি বাজার পার হয়ে হাতের ডানপাশে অল্প এগুতেই চোখে পড়বে ফার্মার্স ভ্যালির বিশাল বাগান। পাহাড়ের উপর সবুজ চাউনি যেন সবাইতে হাতছানি দিয়ে ডাকবে।
চট্টগ্রাম নিউজ / এসডি/
