চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে জাহেদুল ইসলাম প্রকাশ পিচ্চি জাহেদ (৩৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পুরানগড় গ্রামের ভাঙারগোড়া ফরিদ সওদাগরের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত জাহেদুল ইসলাম একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কালীনগর গ্রামের নুরুল ইসলাম প্রকাশ সর্বহারা নুরুর ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত জাহেদুল এর মোটরসাইকেলের পিছনে থাকা মোহাম্মদ ওয়াহিদ (২৮) আহত হয়েছেন। তিনি ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত নুরুল আবছারের ছেলে। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি বাড়িতে ফিরে গেছেন।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পুরানগড় গ্রামের ভাঙারগোড়া ফরিদ সওদাগরের দোকানের সামনে এলাকার কিছু চিহৃিত সন্ত্রাসীসহ ছয়-সাতজন দুর্বৃত্ত সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে জাহেদকে রাস্তায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
স্থানীয়রা গুরুতর আহত জাহেদকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হামলায় ওয়াহিদও আহত হন। তবে তিনি আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, জাহেদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে পুরানগড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা ও দেশিয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল, পরে জামিনে মুক্তি পায়।
পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ হারুনর রশীদ বলেন, ঘটনার শুরুতে আমি মনে করেছিলাম দুর্ঘটনা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি জাহেদ রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন। অপর পাশে তার মোটরসাইকেলটিও পড়ে ছিল। তার মাথার আঘাতের চিহ্ন দেখে কেউ তার কাছেই যাচ্ছিলেন না। পরে আমরা সবাই মিলে তাকে উদ্ধার করে একটি অটোরিকশায় তুলে কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম।
নিহতের মামা শাহেদ আলী বলেন, এলাকার কিছু চিহৃিত সন্ত্রাসীসহ অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ আমার ভাগিনাকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করেছে। এরপর দীর্ঘক্ষণ তার রক্তাক্ত দেহ রাস্তায় পড়ে ছিল। আমরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শীগ্রই মামলা দায়ের করব।
এদিকে নিহত জাহেদুল ইসলামের মোটরসাইকেলের পিছনে থাকা আহত মোহাম্মদ ওয়াহিদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের নিকট ঘটনার সময় মিষ্টি জসিম, রিদোয়ান, মানিক, মিষ্টি টিপু, হাবীবকে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে পুরানগড় ইউনিয়ন বিএনপির সংগঠক জসিম উদ্দিন প্রকাশ মিষ্টি জসিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জাহেদ হঠাৎ করে নতুনহাটে এসে অহেতুক মানিককে মারধর করে দ্রুত সটকে পড়েন। একই সময় আমরা বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রস্তুতি সভা করছিলাম। পরে আমি বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব চুরির বিষয়ে এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও ওসির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে ছিলাম। পরে জাহেদের বিষয়টি আমি বাড়িতে যাওয়ার পর জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় আমার জড়িত থাকার প্রশ্নই উঠে না। এ অভিযোগ সত্য নয়।
তবে এ বিষয়ে উত্তর সাতকানিয়ার সাংগঠনিক উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী রাজিব ও সদস্য সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, অপরাধীর কোন দলীয় পরিচয় নাই। সে যেই হোক না কেন আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমরা সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
নিহত জাহেদুল ইসলাম এর মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী ও দুই ছেলে আগেই মারা গেছে। পুরো সংসার চালানোর ভার ছিল আমার জাহেদের কাঁধের উপর। এখন আমার চার মেয়ে, ছেলের বউ ও পাঁচ ও দেড় বছর বয়সী দুই নাতি-নাতনী রয়েছে। আমার ছেলেকে বিনা দোষে মেরে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার ছেলে দোষ করলে তো আইন আছে, বিচার আছে ও শাস্তি আছে। অন্যায়ভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমার পুরো পরিবারের ভরণ পোষণ কে চালাবে ? সরকারের কাছে আমি ন্যায় বিচার চাই।
জাহেদুলের স্ত্রী নুসরাত জাহান হিরা বলেন, আমার দুই সন্তানের বাবাকে যারা হত্যা করেছে এবং আমাকে যারা বিধবা করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের স্বজন ও আহত ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপর বেশ কয়েকজন অভিযুক্তের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে পাওয়া যায়নি। পরে নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। থানায় এখনো মামলা হয়নি।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
