দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন দলের এই প্রার্থীই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হতে যাচ্ছেন বলে সর্বমহলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফলে নির্বাচনের বাকিপ্রক্রিয়াগুলো এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার রূপ নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুর আড়াইটায় নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে এই মনোনয়নপত্র তুলে দেওয়া হয়। সিইসির সঙ্গে এ সময় ইসি সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের কালিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে মোট দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করা হয়।
দুটি আবেদনপত্রেই প্রস্তাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপির প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, দলের নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এবং হাবিব উন নবী খান সোহেল।
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, বৈঠকের শুরুতেই দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরই দলের দীর্ঘদিনের নিয়ম ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে বিএনপির মহাসচিব ও নীতি-নির্ধারণী স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল।
সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পটভূমি অনুসারে, গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর অসুস্থতার কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে সংবিধানের বিধান মেনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল পালন করছেন স্পিকারের দায়িত্ব।
সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী আজ ১৩ আগস্ট বিকেল চারটা পর্যন্ত ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়। আগামী ১৬ আগস্ট সকালে দাখিলকৃত মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ আগস্ট বিকেল চারটা পর্যন্ত।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন মেনে পরিচালিত এই নির্বাচনে সিইসি মূল নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর সে বছরই রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হয়েছিল। এরপর থেকে পরবর্তী ৩৫ বছর মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
এবার দীর্ঘ সময় পর আবারও নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিরোধীদের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও আজ সকালে জমা দেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ৩৪৯ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে বর্তমানে প্রার্থিতা বাতিল রয়েছে।
এর মধ্যে বিএনপি ও তাদের রাজনৈতিক শরিকদের রয়েছে ২৪৭টি আসন, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধীদের আসনসংখ্যা সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে ৯০টি। বাকি আসনগুলোতে স্বতন্ত্র ও ক্ষুদ্র দলগুলোর প্রার্থীরা রয়েছেন। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করেছেন যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে।
ফলে কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট প্রদান করতে পারবেন না এবং তা করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। এই সংসদীয় দলীয় সমীকরণের কারণে ২০ আগস্টের নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় ব্যবধানে জয় এবং ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া সুনিশ্চিত।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসমডি/
