রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম নিউজ ডেস্ক :

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশে ব্যক্তি উদ্যোগের অবদান দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার আগে যেমন জমিদার ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন যুগের চাহিদা অনুযায়ী অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেশের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

স্বাধীনতার পর থেকে সরকারও ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম এখনো চলমান। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।

একসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো কিংবা প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী আছেন, উন্নত অবকাঠামো আছে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকও রয়েছেন। তবুও একটি বড় সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে—শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি কমে যাওয়া। অনেক শিক্ষার্থী কলেজে এলেও নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেয় না, আবার অনেকে কলেজেই আসে না।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। বর্তমানে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম সহজ হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী দূরবর্তী কলেজে ভর্তি হয়। যাতায়াতের অসুবিধা, আর্থিক সংকট কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির কারণে তারা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা বোর্ডের বিধি অনুযায়ী একাদশ শ্রেণিতে সাময়িক ও সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আগে একাদশ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হতো এবং উত্তীর্ণরাই দ্বাদশ শ্রেণিতে উন্নীত হতে পারত। একইভাবে দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রাক-নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর কেবল নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাই এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ পেত। এরপর অনেক প্রতিষ্ঠান মডেল টেস্ট ও বিশেষ কোচিংয়ের আয়োজন করত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব বিধি-বিধানের অনেকটাই এখন আর কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয় না। শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবক—কেউই আগের মতো নিয়মগুলো কঠোরভাবে মানছে না। ফলে নিয়মিত ক্লাসে অংশ না নিয়েও যদি কোনো শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তাহলে তার শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হওয়ার আগ্রহ কমে যায়। একইভাবে অভিভাবকরাও সন্তানকে নিয়মিত ক্লাসে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না।

উচ্চ মাধ্যমিকের দুই বছর এবং স্নাতক পর্যায়ের তিন বছরের শিক্ষাজীবনে যদি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের শিক্ষার মান ও ফলাফলও উন্নত হবে।

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব যেমন শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, তেমনি অভিভাবকদের দায়িত্ব সন্তানদের নিয়মিত ক্লাসে পাঠানো এবং তাদের পড়াশোনার খোঁজ রাখা। তাই প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

একই সঙ্গে শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। ক্লাস চলাকালীন সময়ে কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ রাখার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক অভিভাবক কলেজে ভর্তি করিয়ে সন্তানদের কোচিংনির্ভর করে তুলছেন। অন্যদিকে শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না আসার কারণেই তারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারছে না। আবার অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করেন, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পাঠদান না হওয়ায় কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এই পারস্পরিক দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর তবেই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে এবং একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে উঠবে।

অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস)

চট্টগ্রাম জেলা শাখা।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

কুরুকপাতায় ম্রো সম্মেলন: নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়নে জোর সেনাবাহিনীর

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে ম্রো জনগোষ্ঠীর ব্যাপক...

মিরসরাইয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা উদ্ধার

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রাস্তার পাশে খাদে গাড়ি...

বদরখালীতে জুতা হারানো নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, পশু চিকিৎসকের মৃত্যু

কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নে জুতা হারানোকে কেন্দ্র করে...

রাঙামাটির মানিকছড়িতে পিকআপ উল্টে ৪ জনের নিহত

রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের মানিকছড়ি এলাকায় পিকআপ নিয়ন্ত্রণ...

নেশার টাকা না দেয়ায় পিতা-মাতাকে মারধর, থানায় অভিযোগ দিতে গিয়ে পিতার মৃত্যু

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নেশার টাকা না পেয়ে পিতা, মাতাকে মারধর...

খাগড়াছড়িতে খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া মাহফিল

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন...

আরও পড়ুন

মাল্টিভোকাল মেমোরিতে ভিন্নমতের প্রান্তিকীকরণ এবং কুর্দি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ইতিহাস আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চেয়েও প্রাচীন, কিন্তু রাষ্ট্রত্বের ইতিহাস প্রায় অনুপস্থিত। তারা হলো কুর্দি জনগোষ্ঠী। United Nations High...

মানিকছড়ির ফার্মার্স ভ্যালি যেন পাহাড়ের চুড়ায় অর্গানিক ফলের একখণ্ড স্বর্গরাজ্য

পাহাড়ি জনপদ মানিকছড়ি। সবুজের বুক চিড়ে এগিয়ে চলেছে আকাবাকা পাহাড়ি পথ। যেদিকে চোখ যায় সবুজের সমারোহে মন জুড়িয়ে যায়। দুপাশে সবুজ পাহাড় আর তার...

গাঢ় নীল-হালকা জলপাই শার্ট ও খাকি প্যান্টে ফিরেছে পুলিশ

গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই রঙের শার্ট এবং খাকি রঙের প্যান্টে ফিরেছে পুলিশের পোশাক। বুধবার (১ জুলাই) নতুন পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা...

দিদিয়ের দ্রগবা: ফুটবলের বাইরে যুদ্ধক্লান্ত মানুষের শান্তির রূপকার

আইভরি কোস্ট একসময় পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম স্টেবল স্টেট এবং "রিজিওনাল ইকোনমিক পাওয়ার" হিসেবে পরিচিত ছিল।ঔপনিবেশিক-পরবর্তী যুগে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণ, তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং...