একজন অতি সাধারন মানুষ। উঠা, বসা, চাল চলন, পোষাক আষাক কোন কিছতেই নেই কোন চাকচিক্য। নিরবে, ধীরপায়ে হেটে চলেছেন। পাশ দিয়ে কে হেটে যাচ্ছেন সেদিকেও যেন খেয়াল নেই। চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে তার ৪০ বছরের পথ চলা। কারো সাথে নেই কোন দ্বন্দ্ব, নেই কোন পদ পদবীর লোভ। কিন্তু স্টেডিয়াম এলাকায় তিনি যেন সব আলোচনার মধ্যমনি। তাকে ছাড়া যেন কোন আসরই জমেনা। এতক্ষণ যার কথা বলছি তিনি মকসুদুর রহমান বুলবুল।
৬৯ বছর বয়সে আজ বৃহস্পতিবার চলে গেলেন পৃথিবীর সফর শেষ করে। সকাল ৮টায় ইন্তেকাল করেন মকসুদুর রহমান বুলবুল। মৃত্যুকালে স্ত্রী, একমাত্র পুত্র সন্তান, মা ভাই সহ অনেক আত্নীয় স্বজন রেখে গেছেন। তবে তার চাইতেও বেশি রেখে গেছেন ক্রীড়াঙ্গনে তার অগনিক বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী। মকসুদুর রহমান বুলবুল চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থায় এলিট পেইন্ট আর সির প্রতিনিধি ছিলেন।

অথচ এই ক্লাব যাদের তারা কোনদিন ক্লাব নিয়ে মাথা ঘামাননি। না মাথা ঘামাননি বললে ভুল হবে। একজন বুলবুলের কারনে তাদের মাথা ঘামাতে হয়নি। তিনি যে একাই সব সামাল দিতেন। এলিট পেইন্ট গ্রুপের মালিক পক্ষ তার আত্নীয় ছিলেননা। কিন্তু যেন ছিলেন পরম আত্নীয়। আজ জানাজায় এলিট পেইন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ যেমন বললেন আমাকে কেউ কোনদিন কোন বিষয়ে জোর করতে পারেনি। পেরেছে কেবল বুলবুল। এ থেকেই বুঝা যায় কতটা পরমাত্মীয় ছিলেন তারা।
যে দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন বুলবুল সেটি যে খুব উচু লেভেলে খেলে বা খেলতো তা কিন্তু না। কিন্তু জেলা ক্রীড়া সংস্থায় তার ছিল দারুন জনপ্রিয়তা। সবসময় ঠোঁটকাটা মানুষ ছিলেন। মুখের উপর বলে দিতেন সবকিছু। পাছে কেউ কি বলবে তা যেন তার ধর্তব্যের মধ্যেও রাখতেন না। অজাতশত্রু এই মানুষটি কখন কি বলবে তা শুনতেই যেন মুখিয়ে থাকতেন তার সহকর্মীরা। বয়সে অনেকটাই প্রবীন হলেও নবীনদের সাথেই চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। গত কয় বছরে শারিরীক ভাবে অসুস্থ থাকলে মনের জোর ছিল পর্বতসম। কি শীত, কি গ্রীস্ম। তুমুল বৃষ্টি আর কাঠফাটা রোদ কোনটাই তাকে নিবৃত্ত করতে পারতোনা স্টেডিয়ামে আসা থেকে। কারন তিনি জানতেন তার জন্য সবাই অপেক্ষা করত। কারন তিনি যে স্টেডিয়ামের আড্ডার মধ্যমনি।
দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা ছিলেন। যখনই যে দায়িত্ব কাঁধে আসতো তা সম্পন্ন করে তবেই থামতেন। একদিন আগেও স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। সবার সাথে আড্ডা দিয়েছেন। হাসি ঠাট্টা করেছেন। সুস্থ শরীরে ফিরে গেছে বাসায়। কিন্তু আজ সকালে তিনি নেই। আগেই বলেছি নবীনদের সাথে চলতে বেশি পছন্দ করতেন।
যেমন জেলা ক্রীড়া সংস্থায় তার আরেক সহকর্মী এনামুল হকের সাথে একটু বেশিই খুনসুটি চলতো। নানা নাটক আর উপন্যাসে যেন একটা কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকতো তেমনি মকসুদুর রহমান বুলবুলের নিত্যদিনের হাস্যরসের কেন্দ্রীয় চরিত্র তেমন থাকতেন এনামুল হক। তবে এনামুল হকের যে তার পছন্দের তালিকায় সবার উপরে থাকতেন তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যেতো যেকোন কাজে কর্মে। মানুষ সচরাচর নিজের পছন্দের মানুষকে সদা উপরে তুলে ধরেন। বুলবুল ও তার ব্যতিক্রম ছিলেননা। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন একজায়গায়। তা হচ্ছে অপছন্দের মানুষকেও প্রকাশ করে দিতেন। এ যেন তার ব্যতিক্রমী চরিত্র। সিনিয়রদের সম্মান আর জুনিয়রদের স্নেহ দেওয়াটা যেন তার রীতিই ছিল। যদিও বর্তমানে জেলা ক্রীড়া সংস্থায় তার চাইতে বয়সে সিনিয়র খুব বেশি নেই।
একজন মানুষ কতটা জনপ্রিয় সেটা বুঝা যায় তার মৃত্যুর পর। চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার অনেক কর্মকর্তা আর কাউন্সিলরের জানাজা হয়েছে স্টেডিয়াম চত্তরে। মকসুদুর রহমান বুলবুলের জানাজা জনসমাগমের দিক থেকে অনেকের চাইতে এগিয়ে থাকবে। সকালে তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তার দামপাড়াস্থ বাসভবনে সতীর্থ সহকর্মীদের ভীড় লেগে যায়। অনেকেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তার এভাবে চলে যাওয়া। তাইতো প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে সবাই ছুটে আসছিল তার বাসভবনে এবং স্টেডিয়ামে।
গত কয় বছরে জেলা ক্রীড়া সংস্থায় আসা অপেক্ষাকৃত নবীন কাউন্সিলরদের সাথে সম্পর্কটা একরকম বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছিল। তাইতো স্টেডিয়ামে আসলেই তাদের সাথে একটু বেশিই সঙ্গ দিতেন এবং সঙ্গ পেতে চাইতেন।
বরাবরই ভোজন রসিক মানুষ ছিলেন মকসুদুর রহমান বুলবুল। আমার সাথে অন্তত ৩০ বছরের সম্পর্কে সেটা আসার বেশ ভালই জানা। গত কয় বছরের অসুস্থতার কারনে তার খাবার দাবারে বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু নিজে খেতে না পারলেও অন্যদের খাইয়ে যেন তৃপ্তি পেতেন। স্টেডিয়ামে আসলেই রায়হান, রাজু, মনি, সাইফুদ্দিন, পাবলু, এনামদের খোজ করতেন। কারো অনেককেই খুজতেন। কিন্তু এদেরকে যেন একটু বেশি খুঁজতেন।
তারাও সদা যোগাযোগ রাখতেন তার সাথে। কোন কারনে স্টেডিয়ামে তার অনুপস্থিতি দেখলে সবার মাঝে কেমন যেন অভাববোধ কাজ করতো। তাইতো তাকে ফোন করে নিয়ে বাসতো সবাই মিলে। কিন্তু আজ থেকে আর কারো ফোন ধরবেননা সবার প্রিয় মকসুদুর রহমান বুলবুল। কারন তিনি যে গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। বিদায় মকসুদুর রহমান বুলবুল। বিদায় একজন নিভৃতচারী ক্রীড়া সংগঠকের।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
