“গাহি সাম্যের গান” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত এই কবিতার পরের লাইনগুলো হয়তো অন্য কোন দেয়ালে আঁকানো হবে। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালি, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, চকরিয়া, বাঁশখালি, সহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেওয়ালে অঙ্কতি হচ্ছে বিভিন্ন চিত্রের ছবি।
এই অঙ্কতি ডিজাইনের কাজ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদ জানিয়ে তারা এসব অঙ্কন করছেন। পটিয়া সরকারি কলেজ, গাছবাড়িয়া সরকারী কলেজে, বিজিসি ট্রাষ্ট ইউনিভার্সিটি, সাতকানিয়া কলেজ সহ বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা।
প্রায় দের যুগ, বাংলার মানুষ স্বাধীনতা পাওয়ার পরেও বাক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে। হারিয়ে ফেলেছে গণমাধ্যমে লেখার স্বাধীনতাও। এতদিন পর গ্রাম, পাড়া-মহল্লায় সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠে ভেসে উঠছে স্বাধীনতার জয়ধ্বনি।
ব্যস্ততম শহরের রাস্তায় নেই কোন গাড়ির শব্দ, নেই যানজটের প্রবনতা। সাধারণ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূলের বাজার গুলোতেও চলছে জোরদার তদারকি। এরই মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়েছে সকল দ্রব্যমূল্যর বাজারদর। বাংলার মানুষ আবারো এক স্বাধীন দেশে বাঁচবে স্বাধীন মুক্ত বাংলায়।
এই স্বাধীন মুক্ত বাংলার পিছনের গল্পে ফিরে আসি। প্রায় এক মাস আগে দেশে কোটা সংস্কার চেয়ে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। তখন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫বছর ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রদের কোটা সংস্কার চেয়ে রাজপথে আসার পর সরকারের পুলিশ ছাত্রদের নির্বিচারে হত্যা করে।
এরপর ফুঁসে ওঠে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। কোটা আন্দোলনে দাবি বাড়ানো হয়, মাঠে নামে বিজিবি, র্যাব, সেনাবাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি করে অনেক ছাত্রদের হত্যা করা হয়।
এরপর শিক্ষার্থীদের আহ্বানে ৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রদের সাথে যোগ দেয় বিভিন্ন শ্রম পেশার মানুষ। রাত পেরোতেই ৫ আগস্ট লং টু মার্চ। পরিকল্পনা ছিলো গনভবন ও সংসদ ভবনে যাওয়ার। লং টু মার্চ এই মিশনে ছাত্রদের ডাকে সারা দেওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি জানতে পেরে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরপর সারাদেশে ছাত্রদের উল্লাস আর উন্মাদনা ছিলো চোখে পড়ার মতো। উল্লাস আর উন্মাদনার কমতি ছিল না পাড়া মহল্লার পথে প্রান্তরে সাদামাটা মানুষগুলোর মুখে।
কিন্তু সুযোগ সন্ধানী কিছু দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালিয়েছে। অনেক সাধারন মানুষ, ছাত্র ও পুলিশকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন থানা। পরবর্তীতে কর্ম বিরতিতে যায় পুলিশ সদস্যরা।
এমন এক পরিস্থিতিতে দেশে নেই কোন সরকার, নেই প্রশাসন। এগিয়ে আসে আন্দোলন করা সেই ছাত্ররা ও ছাত্র সংগঠনগুলো।
হাতে পলিথিনের ব্যাগ ও ঝাড়ু নিয়ে দায়িত্ব নেয় রাস্তা ঘাট থেকে দেশ পরিস্কার করার, কুরচিপূর্ণ মন্তব্য মুছে ফেলে বিভিন্ন শব্দে গ্রাফিতি আঁকা ও যানজট নিরসনে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করা।
সরকার দেশত্যাগের পর গণভবনের আশপাশের এলাকা সহ বরিশাল, চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ রংপুরসহ আরও প্রায় ১৫ টি জেলা জুড়ে গ্রাফিতি আঁকা শহর পরিষ্কার অভিযান ও ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে এসব স্বেচ্ছাসেবী ভলান্টিয়ার শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে যেমন ছিলো শৃঙ্খলা ঠিক তেমনি দেশের একজন সু-নাগরিকের দায়িত্ববোধ।
সভ্যতার সাথে সাথে পুরুষের পাশে নারীরাও এগিয়ে এসেছে, নিজেদের সফলতার শিখরে নিয়ে গেছে। সামনে দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে সবাই একসাথে ভেদাভেদ বিহীন দেশ গড়ে তুলবে।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে শুধু লাল সবুজ সোসাইটি নয় শত শত সংগঠনের তরুণ-তরুণীদের হাতে নতুন বাংলাদেশের এক উদ্ভাবনী স্বপ্ন আঁকা হচ্ছে। যে স্বপ্নের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আন্দোলন করা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শ্রমজীবী সহ দেশের সকল মানুষ।
