মিরসরাইয়ের শাহদাত বয়স মাত্র ১০ বছর হলেও দেখতে তাকে বৃদ্ধের মত দেখায়। যে বয়সে অন্য শিশুদের সাথে খেলাধুলায় মাতিয়ে থাকার কথা, ঠিক সে বয়সে ঘরের মধ্যে বন্ধী শাহাদাতের জীবন। দেখতে বৃদ্ধের মত হওয়ায় অন্য শিশুরা তাঁর সাথে মিশতে চায়না। জন্মের ৪ মাস পর থেকে প্রোজিরিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মো. শাহাদাত হোসেন। সে উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মাইজগাঁও (ইছামতি) গ্রামের দিনমজুর মো. হানিফ ও নাছিমা আক্তার দম্পতির ৩ সন্তানের মধ্যে সে সবার ছোট ছেলে। শাহাদাত মির্জাবাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ছাত্র। বয়স বাড়ার সাথে সাথে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে তাঁর বাবা-মায়ের।
জানা গেছে, জন্মের ৪ মাস পর থেকে হঠাৎ করে শাহাদাতের শরীরে বিরল রোগে বাসা বাধে। তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রায় ২ মাস চিকিৎসা নেওয়ায় পরও কোন উন্নতি হয়নি। চিকিৎসক বলেছেন এ রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। ২ মাস হাসপাতালে থাকার পর তারা গ্রামে চলে আসেন। দু’বছর পর তার শরীরে দেখা দেয় হার্নিয়া রোগ। এরপর অপারেশন করা হয়। তবে এখনো মাঝে মাঝে শরীরে ব্যাথা অনুভব করে সে।
শাহাদাতের বাবা মো. হানিফ বলেন, দুটি মেয়ের পর আমার একটি ছেলে সন্তান হয়। কিন্তু জন্মের কয়েক মাস পর আমার একমাত্র ছেলের শরীরের দেখা দেয় বিরল এক রোগের। এরপর থেকে তাকে নিয়ে চমেক হাসপতালে ছিলাম ২ মাসের মত। ডাক্তারের চিকিৎসা ফ্রি পেয়েছি, কিন্তু ঔষধ তো আর ফিরে পাইনি। জায়গা সম্পত্তি কোন কিছু নাই যে, বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করাবো। একবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য এসে ছবি তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু আর কোন যোগাযোগ করে নাই তারা। আমার ছেলেটা যদি একটু পরিবর্তন হয় তাহলে অন্যান্য মানুষের সাথে চলাফেরা করতে পারতো। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মিরসরাইয়ের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কাছে আকুল আবেদন করবো যেন, আমার ছেলেটার সুস্থতার জন্য যেন একটু সহযোগিতা করে।
মো. হানিফ আরো বলেন, সংসারের একমাত্র উপাজনক্ষম ব্যক্তি আমি। কখনো দিনমজুরের কাজ কখনোবা রিকশা চালিয়ে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ইনকাম করি তা দিয়ে সংসার এবং ছেলের চিকিৎসা খরচ চালাই। রিকশা চালালে মালিককে ইনকাম দিয়ে দিতে হয় প্রতিদিন ২৫০ টাকা। নিজের কোন জায়গা সম্পত্তি নেই। সওজের জায়গার উপর কোন রকমে স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে নিয়ে দিন কাটছে। জানিনা কতদিন থাকতে পারবো এই জায়গার উপর। শুনতেছি রাস্তা নাকি আরও বড় হবে, রাস্তা বড় হলে তো আমাদের এখানে থাকা সম্ভব না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ ঘেঁসে ছোট্ট একটি ঘরে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে থাকেন হানিফ। ঘরের সামনে দূরন্তপনায় মেতেছে শাহাদাত। সাইকেল চালাচ্ছেন, বিভিন্ন কথা বলছেন। সব আচরণ শিশুসুলভ হলেও শরীর দেখে মনে হচ্ছে বাবার চেয়ে ছেলের বয়স বেশি।
অসুস্থ মো. শাহাদাত বলেন, স্কুলের স্যারেরা আমাকে অনেক আদর করে। কিন্তু আমার বন্ধুরা আমার সাথে খেলতে, মিশতে চায় না। আমি সুস্থ হয়ে আমার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতে চাই এবং পড়ালেখা করে বড় হতে চাই।
শাহাদাতের মা নাছিমা আক্তার বলেন, আমার ছেলে শাহাদাতকে দেখলে অন্যান্য ছেলেরা ভয় পাই তখন আমার ছেলে আমাকে বলে, আম্মু আমাকে দেখে সবাই ভয় পায় কেন? তখন আমি বলি বাবারে আল্লাহ তোমাকে বানাইছে সে আল্লাহর কাছে তোমাকে সুন্দর লাগতেছে, আমার কাছেও তোমাকে সুন্দর লাগতেছে। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন করবো যেন, আমার ছেলেটাকে সুস্থ করার জন্য সহযোগিতা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অকাল জরার ইংরেজি পরিভাষা প্রোজিরিয়া (চৎড়মবৎরধ)। যার অর্থ পূর্বে বা অপরিপক্ক এবং “মēৎধং” যার অর্থ বৃদ্ধ বয়স। রোগটি খুবই বিরল এবং খুব কমসংখ্যক শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মায়। অকাল জরাগ্রস্থ রোগী সাধারণত তেরো-চৌদ্দ থেকে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মিনহাজ উদ্দিন বলেন, শিশুটির ছবি দেখে মনে হচ্ছে সে প্রোজিরিয়া রোগে আক্রান্ত। এটা জেনেটিক কারণে হয় এবং এ রোগে অঅক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিরল। শিশু বয়সে গায়ের চামড়া কুচকে যাওয়া, বৃদ্ধের মত দেখতে এসব এ রোগের লক্ষণ। একে দ্রæত ঢাকা পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল কবির ফিরোজ বলেন, হানিফের জায়গা সম্পত্তি বলতে কিছু নেই, তারা খুবই গরিব। তার ছেলে শাহাদাতকে পরিষদ থেকে একটি প্রতিবন্ধি কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও তাকে সহযোগিতা করেছি। ইউএনওর সাথে যোগাযোগ করে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিবো বলেও জানান তিনি।
সাহায্য পাঠাতে চাইলে বিকাশ ও নগদ নম্বর ০১৮৭৮৪৯০৪০৯ (হানিফ বাবা)। ব্যাংক হিসাব ০২৬৩১২২০০০০৩২১৮ (নাছিমা বেগম মা), ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বড়তাকিয়া শাখা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম।
