“Photojournalism is the first evidence of that history being lived.” রঘু রায়ের এই বক্তব্য তাঁর ১৯৭১-এর আলোকচিত্রকে বোঝার জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবেশদ্বার। কারণ তাঁর কাছে ফটোজার্নালিজম কেবল কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার দৃশ্যমান রেকর্ড নয়; বরং ইতিহাস যখন মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতায় মূর্ত হয়ে ওঠে, ফটোগ্রাফ তখন সেই লিভড হিস্ট্রি-এর প্রথম দৃশ্যমান সাক্ষ্য।
১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি জাতীর স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক ব্যাপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়। এটি একই সঙ্গে ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় সামরিক সহিংসতা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সংকট এবং Cold War-এর বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক ঘটনা। কিন্তু রাষ্ট্র, সামরিক শক্তি ও কূটনীতির ভাষায় যে ইতিহাস নির্মিত হয়, তাঁর ক্যামেরা সেই ইতিহাসের অন্য একটি স্তরকে দৃশ্যমান করে। যেখানে ইতিহাসের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ-এর অন্তরালে পড়ে থাকা লিভড এক্সপেরিয়েন্স, অ্যাফেক্ট এবং এমবডিড মেমোরি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে রঘু রায় The Statesman-এর অ্যাসাইনমেন্ট-এ পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থেকে ভারতে আসা শরণার্থীদের ফটোগ্রাফ করতে সীমান্ত অঞ্চলে যান। তাঁর নিজের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তিনি যশোর অঞ্চলে গিয়েছিলেন, মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের ফটোগ্রাফ করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা মানুষের, শিশু বহনকারী পরিবারকে, ভাঙা সেতু এবং পরবর্তীতে ভারতের শরণার্থীশিবির গুলোকে ফটোগ্রাফ করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর অ্যাসাইনমেন্ট একটি নির্দিষ্ট “event” নথিবদ্ধ করার কাজ হিসেবে শুরু হলেও দ্রুত তা একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার ডকুমেন্টেশন-এ পরিণত হয়। যুদ্ধের সামরিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি তিনি অনুসরণ করতে থাকেন ডিসপ্লেসমেন্ট-এর ধারাবাহিকতা।
রঘু রায়ের স্মৃতিতে ১৯৭১-এর একটি দৃশ্য বিশেষভাবে প্রত্যাবর্তনশীল: আগস্টের বর্ষামুখর সময়ে যশোর রোড হয়ে খুলনার দিকে যাওয়ার পথে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা শরণার্থীদের দীর্ঘ স্রোত। আকাশ ছিল ধূসর, অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল; কিন্তু এই দৃশ্যের সবচেয়ে গভীর বৈশিষ্ট্য ছিল নীরবতা। রঘু রায়ের নিজের ভাষায়, “no one talked.”
এই নীরবতা কেবল একটি পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি যুদ্ধের অভিঘাতের একটি ভিজ্যুয়াল কন্ডিশন। কারণ ডিসপ্লেসমেন্ট তাঁদের ভাষা, সামাজিক পরিচিতি এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিনতার একটি বড় অংশ ছিন্ন করেছে। ফলে
তাঁর ১৯৭১-এর ফোটোগ্রাফ-এ নীরবতা কালেক্টিভ ট্রমা-এর এক ঘনীভূত দৃশ্যরূপ।
চলমান এই মানবস্রোত তাঁর ক্যামেরা-তে একটি স্থির ভিজ্যুয়াল ফিল্ড-এ পরিণত হয়। যুদ্ধ তাঁর ফোটোগ্রাফ-এ সরাসরি সংঘর্ষের স্পেক্ট্যাকল হিসেবে উপস্থিত না হয়ে ডিসপ্লেসমেন্ট, ক্লান্তি, অপেক্ষা এবং মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্যমান চিহ্নে রূপ নেয়। মানুষের মুখ, বৃষ্টিতে ভেজা শরীর, ক্লান্ত পদক্ষেপ, শিশুদের বহন করা এবং সামান্য বিলংগিংস নিয়ে এগিয়ে চলা। এসব উপাদানের ভেতর বৃহত্তর এক অস্থিরতার ল্যাটেন্ট প্রেজেন্স তৈরি হয়। ফলে তাঁর ফোটোগ্রাফ-এ দৃশ্যমানতার পরিসর জুড়ে সেই অস্থিরতার প্রতিঘাত একটি অন্তর্লীন অনুভূতি হিসেবে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এখানেই তাঁর ফটোগ্রাফি-এর একটি মৌলিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি ভূরাজনীতিকে মানচিত্রের বিমূর্ত পরিসর থেকে মানুষের শরীর ও জীবনের দৃশ্যমান বাস্তবতায় নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সীমান্ত একটি রাজনৈতিক রেখা; তাঁর ক্যামেরা-তে সেই সীমান্ত হয়ে ওঠে একটি অতিক্রমণশীল মানবস্রোত। রাষ্ট্রের ভাষায় রিফিউজি একটি ডেমোগ্রাফিক ক্যাটেগরি; আর ফটোগ্রাফ-এ সে একটি নির্দিষ্ট মুখ, নির্দিষ্ট শরীর এবং নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্য। ফলে “millions of refugees” একটি পরিসংখ্যানগত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দৃশ্যমান মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। ১৯৭১-এর শরণার্থী সংকটে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল যা এই সংখ্যা সংকটের ব্যাপ্তি বোঝায়; কিন্তু একটি ফটোগ্রাফ সেই বিশাল সংখ্যার মধ্যে একজন মানুষের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে পুনরায় দৃশ্যমান করে।
এই জায়গায় তাঁর “Photographic Gaze”-কে কেবল “Humanitarian Gaze” হিসেবে দেখলে বিষয়টি কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর ছবিতে হিউম্যানিজম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই হিউম্যানিজম একটি নির্দিষ্ট জিওপলিটিক্যাল কনটেক্সট-এর ভিতর কাজ করে। শরণার্থী কেবল একজন অসহায় মানুষ নন; তিনি একটি রাষ্ট্রীয় সংকটের ফল। তাঁর শরীরের ডিসপ্লেসমেন্ট-এর পেছনে রয়েছে সামরিক সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সীমান্তের রাজনীতি এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বৃহত্তর সংকট। তাঁর ফটোগ্রাফিক ফ্রেম-এ এই রাজনৈতিক কাঠামোগুলো কোনো প্রত্যক্ষ ব্যাখ্যারূপে উপস্থিত না হয়ে তাদের মানবিক পরিণতির দৃশ্যমান অভিঘাত হিসেবে উপস্থিত হয়। এই কারণেই তাঁর ফটোগ্রাফি-কে জিওপলিটিক্যাল হিউম্যানিজম-এর দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করা যায়।
ফলে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাঁর ফটোগ্রাফিক অ্যাস্থেটিকস-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১-এর মতো যুদ্ধপরিস্থিতিতে ইমোশনাল ডিট্যাচমেন্ট কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি অতিরিক্ত ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট বা সেন্টিমেন্টালিটি-এর বিপদ সম্পর্কে বলেছেন। এই অ্যাটাচমেন্ট-এর ফলে “truth as it reveals itself” দেখা কঠিন হয়ে যায়। তিনি ইনস্টিংক্ট-এর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নিজেকে কেবল প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে নয়, “an explorer of life” হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর ফটোগ্রাফিক প্র্যাকটিস-এ অ্যাস্থেটিকস-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে কাজ করেছে। ফলে তাঁর ফটোগ্রাফিক প্র্যাকটিস-এর কেন্দ্রে ছিল পরিস্থিতিকে পূর্বনির্ধারিত আবেগ বা মেসেজ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করে তাঁর নিজস্ব জটিলতা পর্যবেক্ষণ করা।
এই অবস্থান থেকে হিউম্যানিজম এবং সেন্টিমেন্টালিটি-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়। একটি ফটোগ্রাফ মানবিক হতে পারে, কিন্তু সেন্টিমেন্টাল হওয়া আবশ্যক নয়। তাঁর ছবিতে সাফারিং আছে, কিন্তু সেই সাফারিং-কে কেবল দর্শকের আবেগকে উত্তেজিত করার উপাদানে পরিণত করা হয়নি। বরং কষ্টকে এমন একটি ভিজ্যুয়াল ফর্ম দেওয়া হয়েছে, যেখানে দর্শককে একই সঙ্গে অনুভব এবং চিন্তা করতে হয়। এই ডিস্টিংকশন তাঁর ১৯৭১-এর কাজকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। কারণ যুদ্ধের ফটোগ্রাফ সহজেই ইমোশনাল স্পেকট্যাকল হয়ে উঠতে পারে; রঘু রায়ের শক্তি অনেকাংশে এই স্পেকট্যাকল-এর পরিবর্তে লিভড এক্সপেরিয়েন্স-এর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে।
Susan Sontag-এর Regarding the Pain of Others এই এথিক্যাল প্রবলেম-টিকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। যুদ্ধ ও সহিংসতার ফটোগ্রাফ আমাদের অন্যের সাফারিং-এর সামনে দাঁড় করায়, কিন্তু ফটোগ্রাফ নিজে সেই সাফারিং-এর পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রদান করে না। একটি রিফিউজি-এর মুখ আমরা দেখতে পারি, কিন্তু তাঁর ডিসপ্লেসমেন্ট-এর কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা ফটোগ্রাফের ফ্রেমের বাইরে থেকে যায়। ফলে যুদ্ধের ফটোগ্রাফ একই সঙ্গে এভিডেন্স এবং ইনকমপ্লিট নলেজ। রঘু রায়ের ছবিও এই দ্বৈততার বাইরে নয়। তাঁর ফটোগ্রাফ ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে, but it does not, in itself, contain the complete interpretation of history.
এই সীমাবদ্ধতাই ফোটোগ্রাফ-এর শক্তিকেও নির্দেশ করে। একটি ছবি যখন একজন শরণার্থীর মুখ দেখায়, তখন তা “১৯৭১”কে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করে না; বরং দর্শককে সেই ইতিহাসের একটি মানবিক মুহূর্তের সামনে দাঁড় করায়। ফোটোগ্রাফ তখন ইতিহাসের বিকল্প নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গে একটি এনকাউন্টার। এই এনকাউন্টার-এর মাধ্যমে বৃহৎ রাজনৈতিক সংকট ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিসরে প্রবেশ করে। ফলে ফোটোগ্রাফ-এর কাজ কেবল “ What happened? ” বলা নয়; বরং কীভাবে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাত ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও স্মৃতির পরিসরে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে—তার একটি দৃশ্যমান বিন্যাস নির্মাণ করা।
বাস্তবতার রেকর্ড-ও ক্যামেরা-এর নির্বাচিত দৃশ্যমানতার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল ফর্ম-এ সংগঠিত হয়। ফলে কোনো ফটোগ্রাফ বাস্তবতার রেকর্ড হলেই তা কম্পোজিশন-এর বাইরে অবস্থান করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, তাঁর ১৯৭১-এর ছবির ডকুমেন্টারি ক্রেডিবিলিটি এবং আর্টিস্টিক কনস্ট্রাকশন পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং তাঁর ছবির ভিজ্যুয়াল অর্গানাইজেশন-ই অনেক সময় একটি সাধারণ তথ্যকে লিভড এক্সপেরিয়েন্স-এর অনুভূতিতে রূপান্তরিত করে।
Roland Barthes-এর ক্যামেরা লুসিডা-র স্টুডিয়াম এবং পাঙ্কটাম ধারণা এই ট্রান্সফরমেশন-কে আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝাতে সাহায্য করে। একটি ফটোগ্রাফ-এর স্টুডিয়াম-এর মধ্যে রয়েছে তার সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অর্থ—মুক্তিযুদ্ধ, রিফিউজি ক্রাইসিস, সীমান্ত, ডিসপ্লেসমেন্ট, সামরিক সহিংসতা ইত্যাদি। কিন্তু সেই বৃহৎ অর্থের ভিতর কোনো একটি মুখ, দৃষ্টি, জেসচার বা স্পেশাল ডিটেইল দর্শকের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আকস্মিকভাবে স্পর্শ করতে পারে। Barthes-এর ভাষায় পাঙ্কটাম হলো সেই “prick”, যা ফটোগ্রাফ-এর স্টুডিয়াম-নির্ভর সাধারণ সাংস্কৃতিক অর্থের মধ্যে থেকেও দর্শককে ব্যক্তিগতভাবে বিদ্ধ করে। রঘু রায়ের ১৯৭১-এর ছবিতে তাই কালেক্টিভ হিস্ট্রি এবং ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাফেক্ট একই ফ্রেম-এ সহাবস্থান করতে পারে।
নারী ও শিশুর ফটোগ্রাফ-এর ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, “Women suffer a lot more than men,” এবং শিশুদের ভালনারেবিলিটি-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে হিউম্যানিটারিয়ান ওরিয়েন্টেশন স্পষ্ট। তবে কনটেম্পোরারি ভিজ্যুয়াল এথিক্স-এর দৃষ্টিতে আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: নারী ও শিশুকে কি কেবল সাফারিং-এর প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, নাকি তাঁদের ডিগনিটি, ইন্ডিভিজুয়ালিটি এবং প্রেজেন্স-ও দৃশ্যমান থাকছে? অন্যের সাফারিং ফটোগ্রাফ করার মধ্যে ফটোগ্রাফার এবং সাবজেক্ট-এর একটি অসম ক্ষমতাসম্পর্ক থাকে। ফলে হিউম্যানিস্ট ফটোগ্রাফি-এর নৈতিকতা কেবল ফটোগ্রাফার-এর উদ্দেশ্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না; ফ্রেম-এর মধ্যে সাবজেক্ট কীভাবে উপস্থিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই এথিক্যাল টেনশন তাঁর ডিক্লেয়ার্ড ফটোগ্রাফিক ফিলোসফি-কে নতুনভাবে পড়ার সুযোগ দেয়। তিনি সেন্টিমেন্টালিটি-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাঁর ফটোগ্রাফ সম্পূর্ণ আবেগমুক্ত নয়। বরং তাঁর কাজের বিশেষত্ব হলো আবেগকে নাটকীয়ভাবে নির্দেশ না করে ভিজ্যুয়াল সিচুয়েশন-এর মধ্যে উপস্থিত হতে দেওয়া। দর্শককে কী অনুভব করতে হবে, তা ফটোগ্রাফ সরাসরি বলে দেয় না। একটি মুখ, একটি দৃষ্টি কিংবা একটি নীরব জনস্রোত দর্শকের নিজের অ্যাফেক্টিভ রেসপন্স-এর জন্য জায়গা তৈরি করে। এই অর্থে তাঁর ফটোগ্রাফি-এর এথিক্যাল স্ট্রেংথ অনেকাংশে তার রেস্ট্রেইন্ট-এর মধ্যে নিহিত।
Walter Benjamin-এর ফটোগ্রাফি এবং মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন-এর তত্ত্ব এই ছবির পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ফটোগ্রাফ নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের বাস্তবতা থেকে জন্ম নিলেও নিউজপেপার, ম্যাগাজিন, বুক, এক্সিবিশন এবং পরবর্তীকালে ডিজিটাল আর্কাইভ-এর মাধ্যমে তা নতুন পাবলিক কনটেক্সট-এ প্রবেশ করে। ফলে সীমান্তবর্তী একটি রিফিউজি ক্রাইসিস আন্তর্জাতিক পাবলিক স্ফিয়ার-এর অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফটোগ্রাফ তখন আর শুধু ফটোগ্রাফার-এর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তার রিপ্রোডাকশন এবং সার্কুলেশন তাকে নতুন দর্শক, নতুন সময় এবং নতুন রাজনৈতিক অর্থের সঙ্গে যুক্ত করে। এই দিক থেকে রঘু রায়ের ১৯৭১-এর ছবির সার্কুলেশন নিজেই ভিজ্যুয়াল পলিটিক্স-এর একটি অংশ।
তাঁর ১৯৭১-এর ফটোগ্রাফ-কে মূলত ওভার্ট পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা হিসেবে পড়া যায় না। রঘু রায় ফটোগ্রাফি-র ওপর প্রিডিটারমাইন্ড “agenda” আরোপের বিরোধিতা করেছেন এবং “agenda”-র কথা বলেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতির “truth and the sense of a situation” ধারণ করা। কিন্তু কোনো প্রিডিটারমাইন্ড পলিটিক্যাল মেসেজ না থাকা মানেই ফটোগ্রাফ অ্যাপলিটিক্যাল নয়। বরং তাঁর রাজনৈতিকতা নিহিত রয়েছে এমন এক ভিজ্যুয়াল স্ট্র্যাটেজি-তে, যেখানে রাষ্ট্র, সীমান্ত ও যুদ্ধের মতো বৃহৎ কাঠামো সরাসরি স্লোগান বা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট-এ পরিণত না হয়ে মানুষের জীবনের কনসিকোয়েন্স হিসেবে দৃশ্যমান হয়। তাঁর ক্যামেরা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে হিউম্যান সিচুয়েশন-এর মধ্যে দৃশ্যমান করে তোলে।
তাঁর ছবির অ্যাস্থেটিক কোয়ালিটি-কে তাই সাফারিং-এর অলংকারায়ন হিসেবে না দেখে তার ভিজ্যুয়াল আর্টিকুলেশন হিসেবে পাঠ করা অধিক ফলপ্রসূ। কম্পোজিশন এখানে সাফারিং-কে একটি অ্যাস্থেটিক ফর্ম-এ রূপান্তরের সরল প্রয়াস নয়; বরং তার তীব্রতা, নীরবতা এবং জটিলতা কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ভিজ্যুয়াল স্ট্রাকচার-এর মধ্য দিয়ে অনুভবযোগ্য হয়ে ওঠে, তারই অংশ। ফ্রেমিং ও স্পেশিয়াল রিলেশনশিপ দর্শকের দৃষ্টি পরিচালনা করে, কিন্তু সাফারিং-এর অর্থকে এককভাবে স্থির করে না। এই কারণেই তাঁর ফটোগ্রাফ-এ অ্যাস্থেটিক ডকুমেন্টারি ট্রুথ-এর বিপরীতে কোনো স্বতন্ত্র স্তর নয়; বরং সেই ট্রুথ-কে অনুভবযোগ্য ও দৃশ্যগ্রাহ্য করে তোলার একটি মাধ্যম।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে নাইন্টিন্থ-সেঞ্চুরি রিয়ালিজম-এর সঙ্গে তাঁর ফটোগ্রাফি-এর একটি দূরবর্তী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাস্থেটিক কনটিনিউইটি খুঁজে পাওয়া যায়। রিয়ালিস্ট শিল্পীরা সাধারণ মানুষকে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট ম্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে শিল্পের উপযুক্ত বিষয় হিসেবে সামনে এনেছিলেন। রঘু রায়ের ফটোগ্রাফি সেই হিউম্যান-সেন্টার্ড ট্র্যাডিশন-কে ডকুমেন্টারি মিডিয়াম-এর মাধ্যমে একটি এক্সট্রিম হিস্টোরিক্যাল ক্রাইসিস-এর মধ্যে নিয়ে আসে। তাঁর সাবজেক্ট অর্ডিনারি পিপল, কিন্তু সার্কামস্ট্যান্সেস এক্সট্রাঅর্ডিনারি। ফলে একজন সাধারণ মানুষের শরীরও বৃহৎ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে ১৬ ডিসেম্বর একটি “Decisive Symbolic Moment।” কিন্তু সেই বিজয়ের পূর্ববর্তী ইতিহাস ছিল অসংখ্য মানুষের ডিসপ্লেসমেন্ট, মৃত্যু, নির্যাতন, ক্ষুধা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। তাঁর ক্যামেরা বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তের পাশাপাশি সেই বিজয়ের পূর্ববর্তী দীর্ঘ হিস্টোরিক্যাল প্যাসেজ-এর দিকেও তাকায়। ফলে তাঁর ফটোগ্রাফ জাতীয় স্মৃতিকে অস্বীকার করে না; বরং তাকে আরও গভীর করে। স্বাধীনতার ইতিহাস তখন কেবল একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস নয়; এটি ঘর হারানো, সীমান্ত অতিক্রম, অপেক্ষা এবং বেঁচে থাকারও ইতিহাস।
এই জায়গায় “geopolitical humanism” ধারণাটি বিশেষভাবে কার্যকর। “Geopolitical” কারণ তাঁর ফটোগ্রাফ রাষ্ট্র, সীমান্ত, যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, রিফিউজি ক্রাইসিস এবং আন্তর্জাতিক সংকটের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আর “Humanism” কারণ সেই বৃহৎ কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের লিভড এক্সপেরিয়েন্স। তিনি ভূরাজনীতিকে অস্বীকার করেন না; বরং তার হিউম্যান কনসিকোয়েন্স-কে দৃশ্যমান করেন। মানচিত্র যেখানে সীমান্তের রেখা দেখায়, তাঁর ক্যামেরা সেখানে সেই রেখা অতিক্রম করা মানুষের শরীর দেখায়। রাষ্ট্র যেখানে রিফিউজিকে একটি ক্যাটেগরি হিসেবে দেখে, তাঁর ফটোগ্রাফ সেখানে তাকে একজন ব্যক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
Benjamin এবং Barthes-এর তত্ত্ব এই জিওপলিটিক্যাল হিউম্যানিজম-এর দুটি ভিন্ন মাত্রা বুঝতে সাহায্য করে। Benjamin ফটোগ্রাফ-এর রিপ্রোডাকশন ও সার্কুলেশন-এর মাধ্যমে তার পাবলিক এবং পলিটিক্যাল লাইফ বোঝার সুযোগ দেন। Barthes দেখান কীভাবে একটি ফটোগ্রাফ-এর ক্ষুদ্র ভিজ্যুয়াল ডিটেইল পরবর্তী কোনো দর্শকের ব্যক্তিগত অ্যাফেক্ট ও মেমোরি-কে স্পর্শ করতে পারে। ফলে রঘু রায়ের ফটোগ্রাফ একই সঙ্গে পাবলিক হিস্ট্রি এবং প্রাইভেট মেমোরি-এর বাহক হয়ে ওঠে। একটি ফটোগ্রাফ যখন নতুন দর্শকের সামনে আসে, তখন তার অর্থ কেবল ১৯৭১-এর অরিজিনাল কনটেক্সট-এ সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রতিটি নতুন দর্শক তার নিজের হিস্টোরিক্যাল কনশাসনেস-এর মধ্য দিয়ে তাকে পুনরায় পাঠ করে। এই ভিজ্যুয়াল ইমিডিয়েসি-র কারণেই তাঁর ১৯৭১-এর ফটোগ্রাফ কনটেম্পোরারি দর্শকের কাছেও অতীতকে কেবল তথ্য হিসেবে নয়, একটি লিভড হিস্টোরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স হিসেবে এনকাউন্টার করার সুযোগ তৈরি করে।
তাঁর ১৯৭১-এর আলোকচিত্রকে শুধু “মুক্তিযুদ্ধের ছবি” হিসেবে অভিহিত করা কার্যত তাঁর ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করে। এগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ, রিফিউজি হিস্ট্রি-এর দলিল এবং রাষ্ট্র, সীমান্ত ও ভূরাজনীতির মানবিক অভিঘাতের ভিজ্যুয়াল টেস্টিমনি। তাঁর ফটোগ্রাফ-এ ইতিহাসের স্কেল পরিবর্তিত হয়: ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান যেখানে “millions of refugees” বলে, ফটোগ্রাফ সেখানে একজন মানুষকে দেখায়; ভূরাজনীতি যেখানে “border” বলে, ফটোগ্রাফ সেখানে সেই বর্ডার অতিক্রম করা শরীরকে দেখায়; সামরিক ইতিহাস যেখানে “war” বলে, ফটোগ্রাফ সেখানে অপেক্ষা, ক্লান্তি, ক্ষুধা, নীরবতা ও বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা দেখায়। এই “scale of vision”-ই তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। Raghu Rai’s scale of vision extends beyond the conventional frame of war photography.
শেষ পর্যন্ত রগু রায়ের ১৯৭১-এর ফটোগ্রাফ-এর প্রকৃত বিষয় কেবল যুদ্ধ নয়; বরং “the entry of history into human life.” তিনি ভূরাজনীতিকে মানুষের মুখে, রাষ্ট্রীয় সংকটকে শরীরে এবং বৃহৎ ইতিহাসের অভিঘাতকে ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার দৃশ্যমান পরিসরে রূপ দিয়েছেন। তাই তাঁর ফটোগ্রাফ-এ ১৯৭১ শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মের স্মৃতি নয়; এটি ঘর হারানো, সীমান্ত অতিক্রম, অপেক্ষা, সাফারিং এবং বেঁচে থাকার স্মৃতি। তাঁর ক্যামেরা যে ইতিহাসকে ধারণ করে, তা বিজয়ের ইতিহাসের পাশাপাশি ডিসপ্লেসমেন্ট-এরও ইতিহাস; রাষ্ট্রের ইতিহাসের পাশাপাশি মানুষের ইতিহাস। For this reason, his photographs of 1971 represent a significant photographic archive within the modern history of South Asia, where human experience, state power, geopolitics, memory, and aesthetics converge.
প্রদীপ আইচ, লেখক।
ছবি : রগু রায়।
