সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

ইন্দো-প্যাসিফিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা: ক্ষমতার রূপান্তর, আঞ্চলিক পরিচয় ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা

অনলাইন ডেস্ক, চট্টগ্রাম নিউজ

একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “ইন্দো-প্যাসিফিক” (Indo-Pacific) ধারণাটি কেবল একটি ভৌগোলিক পরিভাষা নয়; বরং এটি সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী জিওপলিটিক্যাল মেটা-ন্যারেটিভ-এ পরিণত হয়েছে।  যা বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার বিন্যাস, রিজিওনাল আইডেন্টিটি রিকনস্ট্রাকশন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা-এর নতুন রূপরেখা নির্ধারণ করছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জিওপলিটিক্যাল ইমাজিনেশন ও রিজিওনাল ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বরাজনীতির চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কোল্ড ওয়ার-এর যুগে “ইউরো-আটলান্টিক” (Euro-Atlantic) অঞ্চল ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান স্ট্র্যাটেজিক থিয়েটার। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তঃনির্ভরশীলতার সম্প্রসারণ এবং সামরিক-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে একটি নতুন জিওপলিটিক্যাল রিয়েলিটি গড়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগর (Indian Ocean) ও প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean) কে একটি সমন্বিত স্ট্র্যাটেজিক স্পেস হিসেবে পুনর্কল্পনা করার মাধ্যমে “ইন্দো-প্যাসিফিক” ধারণাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষা, অ্যানালিটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক এবং পলিসি ওরিয়েন্টেশন-এ একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

এই ধারণার উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক ব্যালান্স অব পাওয়ার-এ সংঘটিত কাঠামোগত রূপান্তর বা স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন। বিংশ শতাব্দীর অন্তিম দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিপোলার প্রাধান্য তুলনামূলকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান সেই ক্ষমতা-বিন্যাসকে ক্রমবর্ধমানভাবে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি চীন তার মেরিটাইম ক্যাপাবিলিটি, টেকনোলজিক্যাল পাওয়ার এবং গ্লোবাল ইনফ্লুয়েন্স উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করেছে।

এর ফলে ভারত মহাসাগর থেকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলত, ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণাটি পরিবর্তিত পাওয়ার ডাইনামিকস-কে ব্যাখ্যা, প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং কৌশলগতভাবে ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টেলেকচুয়াল অ্যান্ড পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য এর জিও-ইকোনমিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যা বসবাস করে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও নীতিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দো-প্যাসিফিকভুক্ত অর্থনীতিগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট জিডিপি-এর প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন করে, যা এ অঞ্চলকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে (Observer Research Foundation, 2021; Handbook of Indo-Pacific Studies, 2023)।

একই সঙ্গে বিশ্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সি লাইনস অব কমিউনিকেশন (SLOCs)-এর অধিকাংশ ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদ পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোতে প্রধানত এই সমুদ্রপথের মাধ্যমেই পরিবাহিত হয়। ফলে ম্যারিটাইম সিকিউরিটি, ফ্রিডম অব ন্যাভিগেশন এবং কমার্শিয়াল শিপিং-এর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম বজায় রাখার জন্যও অপরিহার্য।

এই জিও-ইকোনমিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি, সামুদ্রিক যোগাযোগপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বৃহৎ শক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান স্ট্র্যাটেজিক অবজেকটিভ-এ পরিণত হয়েছে।

এই মেটা-ন্যারেটিভ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি শুধু বিদ্যমান বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না; বরং সেই বাস্তবতার সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কনস্ট্রাকটিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, আইডিয়াস, ডিসকোর্স এবং আইডেন্টিটি রাষ্ট্রের আচরণ ও স্বার্থকে প্রভাবিত করে।

এই আলোকে একে একটি পলিটিক্যাল কনস্ট্রাকশন হিসেবে দেখা যায়, যা বিভিন্ন রাষ্ট্রকে একটি নতুন স্ট্র্যাটেজিক আইডেন্টিটি-র অধীনে একত্রিত করেছে।

পূর্বে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়াকে পৃথক জিওপলিটিক্যাল রিজিয়নস হিসেবে বিশ্লেষণ করা হলেও, এই ধারণা অঞ্চলগুলোকে একটি ইন্টিগ্রেটেড স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেম-এ রূপান্তরিত করেছে, যেখানে সিকিউরিটি, ইকোনমি এবং জিওপলিটিকস পরস্পর গভীরভাবে ইন্টারকানেক্টেড।

শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে এই ধারণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রিয়ালিস্ট থিওরি অনুসারে, রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ব্যালান্সিং বিহেভিয়ার অনুসরণ করে।

চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেশন ক্রমশ গভীরতর হয়েছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ, যা চারটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেশন-এর একটি উল্লেখযোগ্য প্ল্যাটফর্ম। যদিও এটি আনুষ্ঠানিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স নয়, তা সত্ত্বেও এটি রিজিওনাল ব্যালান্স অব পাওয়ার বজায় রাখার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে অকাস চুক্তি আঞ্চলিক সিকিউরিটি আর্কিটেকচার-এ নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণাটি প্রায়শই একটি পলিটিক্যাল এবং স্ট্র্যাটেজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিভাত হয়। বেইজিংয়ের মতে, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন একটি জিওপলিটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য চীনের উত্থানকে কনটেইন করা।

এই কারণে চীন “এশিয়া-প্যাসিফিক” (Asia-Pacific) ধারণাকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে এবং তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে ইউরেশিয়া, আফ্রিকা এবং ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন-এ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ফলে এই কাঠামোকে কেন্দ্র করে যে জিওপলিটিক্যাল কম্পিটিশন গড়ে উঠেছে, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতারই বহিঃপ্রকাশ।

আঞ্চলিক পরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই ধারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যানালিটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রিজিয়ন কোনো স্বতঃসিদ্ধ বা স্থির বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি সোশ্যালি কনস্ট্রাক্টেড কনসেপ্ট। এর মাধ্যমে ভারতকে প্রথমবারের মতো পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিকিউরিটি আর্কিটেকচার-এর কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে প্রধানত একটি সাউথ এশিয়ান পাওয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে তাকে একটি বৃহত্তর মেরিটাইম পাওয়ার এবং এই আঞ্চলিক সিকিউরিটি অর্ডার-এর অন্যতম প্রধান পিলার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে ভারতের ইন্টারন্যাশনাল আইডেন্টিটি, স্ট্র্যাটেজিক সিগনিফিক্যান্স এবং জিওপলিটিক্যাল প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই নতুন রিজিওনাল আইডেন্টিটি একটি নতুন ডিপ্লোম্যাটিক এবং স্ট্র্যাটেজিক স্পেস সৃষ্টি করেছে। অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (ASEAN) দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে “আসিয়ান সেন্ট্রালিটি” নীতি অনুসরণ করে আসছে।

কিন্তু ইউএস-চায়না স্ট্র্যাটেজিক কম্পিটিশন তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়ান দেশগুলো নিজেদের অবস্থান আরও সুস্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। ফলস্বরূপ, আসিয়ান আউটলুক অন দ্য ইন্দো-প্যাসিফিক (AOIP)-এর মাধ্যমে তারা এমন একটি রিজিওনাল ভিশন উপস্থাপন করেছে, যা ইনক্লুসিভিটি, কো-অপারেশন এবং ওপেননেস-কে প্রাধান্য দেয়।

এই মেটা-ন্যারেটিভ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো মেরিটাইম জিওপলিটিক্স। আলফ্রেড থেয়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan) যুক্তি দিয়েছিলেন যে সি কন্ট্রোল বৈশ্বিক শক্তির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে তার এই ধারণা নতুন প্রাসঙ্গিকতা লাভ করেছে।

সাউথ চায়না সি, স্ট্রেইট অব মালাক্কা, লম্বক স্ট্রেইট এবং স্ট্রেইট অব হরমুজ-এর মতো স্ট্র্যাটেজিক চোকপয়েন্টস-এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়। চীনের নেভাল মডার্নাইজেশন, আর্টিফিশিয়াল আইল্যান্ড কনস্ট্রাকশন এবং মেরিটাইম ক্লেইমস একদিকে যেমন আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেভাল প্রেজেন্স-ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এই কৌশলগত অঞ্চল ক্রমশ মেরিটাইম পাওয়ার কম্পিটিশন-এর প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও এই মেটা-ন্যারেটিভ-এর একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এই ভূরাজনৈতিক পরিসর কেবল সিকিউরিটি বা মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি-র ক্ষেত্র নয়; এটি ট্রেড, টেকনোলজি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনস-এর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের বিকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য পার্টনার স্টেটস বিভিন্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্সিং ইনিশিয়েটিভ গ্রহণ করেছে। সেমিকন্ডাক্টর, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ফাইভ-জি টেকনোলজি এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেলস-কে কেন্দ্র করে যে প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে, তা আঞ্চলিক কৌশলগত চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে জিওপলিটিক্স ও জিওইকোনমিক্স-এর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে।

ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য এই অঞ্চল একই সঙ্গে অপরচুনিটি এবং চ্যালেঞ্জ-এর ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কা-র মতো রাষ্ট্রগুলো একদিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর ইনভেস্টমেন্ট, ট্রেড এবং সিকিউরিটি কো-অপারেশন থেকে উপকৃত হতে চায়, অন্যদিকে কোনো একক শক্তির স্ফিয়ার অব ইনফ্লুয়েন্স-এ আবদ্ধ হওয়া এড়াতে সচেষ্ট।

এই কারণে তারা প্রায়শই হেজিং স্ট্র্যাটেজি বা স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সিং পলিসি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পলিসি ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, কারণ দেশটি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ব্লু ইকোনমি, রিজিওনাল কানেক্টিভিটি এবং গ্লোবাল ট্রেড নেটওয়ার্কস-এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

তবে এই ধারণার সমালোচনাও বিদ্যমান। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি একটি ওভারলি ব্রড এবং কনসেপ্টুয়ালি অ্যামবিগুয়াস ফ্রেমওয়ার্ক, যার নির্দিষ্ট জিওগ্রাফিক্যাল বাউন্ডারি নেই।

বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্টস অনুসারে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং আসিয়ান-এর ভিশন-এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে এটি কখনো কখনো একটি কোহেরেন্ট স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক-এর পরিবর্তে ডিপ্লোম্যাটিক ডিসকোর্স বা পলিটিক্যাল রেটরিক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

একই সঙ্গে এই ধারণা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করার ঝুঁকিও বহন করে। যদি এটি কেবলমাত্র চায়না-কনটেইনমেন্ট সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক-এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা রিজিওনাল স্ট্যাবিলিটি-এর জন্য বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।

অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সামরিকায়ন এবং জিওপলিটিক্যাল পোলারাইজেশন বৃদ্ধি পেলে ডেভেলপিং স্টেটস-গুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই বহু রাষ্ট্র একটি ইনক্লুসিভ, কো-অপারেটিভ এবং রুলস-বেসড রিজিওনাল অর্ডার-এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে।

সর্বোপরি, “ইন্দো-প্যাসিফিক” একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জিওপলিটিক্যাল মেটা-ন্যারেটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলকে নির্দেশ করে না; বরং বৈশ্বিক পাওয়ার ট্রানজিশন, রিজিওনাল আইডেন্টিটি ফরমেশন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি বিস্তৃত এক্সপ্লানেটরি ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে। চীনের উত্থান, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক রিব্যালান্সিং, ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং ম্যারিটাইম জিওপলিটিক্স-এর গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে এই ধারণা আজ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অধ্যয়নের কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার চরিত্র অনেকাংশেই নির্ধারিত হবে এই অঞ্চলে ব্যালান্স অব পাওয়ার কীভাবে গঠিত হয়, রিজিওনাল আইডেন্টিটি কীভাবে বিকশিত হয় এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা কতটা কো-অপারেটিভ অথবা কনফ্লিকচুয়াল রূপ ধারণ করে তার ওপর।

সুতরাং, এই ধারণাকে অনুধাবন করা মানে কেবল একটি অঞ্চলের ভূরাজনীতি বোঝা নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, ট্রান্সফরমেশন এবং সম্ভাব্য ফিউচার ওয়ার্ল্ড অর্ডার-কে অনুধাবন করা।

প্রদীপ আইচ, লেখক।

চট্টগ্রাম নিউজ / এসডি/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

আনোয়ারায় মদ সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চোলাই মদ সেবনের দায়ে দুই যুবককে অর্থদণ্ড...

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২য় বার্ষিকীতে এ্যাব চট্টগ্রাম বিভাগের আলোচনা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী

ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২য় বার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রামে আলোচনা সভা,...

কুরুকপাতায় ম্রো সম্মেলন: নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়নে জোর সেনাবাহিনীর

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে ম্রো জনগোষ্ঠীর ব্যাপক...

মিরসরাইয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা উদ্ধার

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রাস্তার পাশে খাদে গাড়ি...

বদরখালীতে জুতা হারানো নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, পশু চিকিৎসকের মৃত্যু

কক্সবাজারের মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নে জুতা হারানোকে কেন্দ্র করে...

রাঙামাটির মানিকছড়িতে পিকআপ উল্টে ৪ জনের নিহত

রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের মানিকছড়ি এলাকায় পিকআপ নিয়ন্ত্রণ...

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।আজ সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।প্রধানমন্ত্রীর...

মাল্টিভোকাল মেমোরিতে ভিন্নমতের প্রান্তিকীকরণ এবং কুর্দি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ইতিহাস আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চেয়েও প্রাচীন, কিন্তু রাষ্ট্রত্বের ইতিহাস প্রায় অনুপস্থিত। তারা হলো কুর্দি জনগোষ্ঠী। United Nations High...

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন দূতের বৈঠক: সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর।শনিবার (১ আগস্ট) সকাল সাড়ে...

কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গমসহ কৃষি ও অন্যান্য খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।তিনি বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক...