চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে নবগঠিত র্যাব ও পুলিশ ক্যাম্প লক্ষ্য করে গভীর রাতে একযোগে ভয়াবহ সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সন্ত্রাসীরা। পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে তারা যে পরিকল্পিত ভাবে ছক কষেছিল বলে জানান আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারীবাহিনীর সদস্যরা।
রবিবার ২৪ মে রাত ১টার দিকে হঠাৎ ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসে সন্ত্রাসীরা নবগঠিত র্যাব ক্যাম্পের দেয়াল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় এবং চারদিক থেকে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ শুরু করে।
খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, র্যাব এবং পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল যৌথ বাহিনী সমস্ত বাধা পেরিয়ে পুরো এলাকা চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলেছে এবং পাল্টা জবাব দিলে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সেখানে বড় ধরনের চিরুনি অভিযান চলছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন র্যাব–৭-এর কমান্ডিং কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে নন-লেথাল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে যৌথ বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
তিনি জানান, বর্তমানে যৌথ বাহিনী এলাকাজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে তল্লাশি কার্যক্রমও চলছে।
রাত ৩টা পর্যন্ত র্যাব সদস্যরা নন-লিথাল অস্ত্র ও পাল্টা গুলি ছুড়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তুমুল গোলাগুলিতে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

নির্মাণাধীন ক্যাম্পের এক রাজমিস্ত্রি বলেন, “আমরা খাওয়া দাওয়া করে রাত ১টার দিকে নির্মাণ শেডে ঘুমাতে যাই। এসময় হঠাৎ গুলি শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি ক্যাম্পের সামনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা আলী নগর স্কুলের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। সেদিক থেকে গুলির শব্দ বেশি শোনা যাচ্ছিল।
“এসময় পূর্ব দিক থেকে একটি ট্রাক আসে, তার পেছনে কয়েকশ লোক লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে দৌঁড়ে আসে। তারা ক্যাম্পে হামলা চালায়।”
আরেক রাজমিস্ত্রি বলেন, পূর্ব দিক থেকে যারা এসেছিল, তাদের তিনি গুলি ছুঁড়তে দেখেছেন।
“এসময় তারা পাথর ও গুলি ছুড়ে লাইট পোস্টের লাইটগুলো ভেঙে দিতে শুরু করে। আমরা তিনজন ভয়ে নালায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। আর চারজন দৌড়ে গিয়ে নির্মাণাধীন ক্যাম্পের বিপরীতে আমাদের থাকার ঘরে ঢুকে যায়। সন্ত্রাসীরা সেখানে গিয়ে আমাদের এক শ্রমিককে ব্যাপক মারধর করে এবং টাকা পয়সা নিয়ে যায়।”
ঘটনাস্থলে র্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “আলী নগরের সন্ত্রাসী ইয়াছিন গ্রুপের দুই-তিনশ সন্ত্রাসী এই হামলা চালিয়েছে। দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, রামদার পাশাপাশি একে-৪৭, চায়নিজ রাইফেল এ ধরনের অস্ত্র নিয়ে তারা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করে।”
এরপর দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রচুর পরিমাণে গোলাগুলি হয়েছে। তবে কেউ আহত হয়নি। আমাদের বেশিরভাগ টিয়ার শেল ও শটগানের বুলেট খরচ হয়েছে। লাস্ট মোমেন্টে তারা যখন একে-৪৭ দিয়ে ফায়ার করেছিল, তখন আমাদের অল্প কিছু রাইফেল দিয়ে ফায়ার করেছে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা।”
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভাংচুর করে সন্ত্রাসীরা। ছবি: সুমন বাবু
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভাংচুর করে সন্ত্রাসীরা। ছবি: সুমন বাবু
র্যাব-৭ অধিনায়কের দাবি, এক্সক্যাভেটর দিয়ে স্কুলের পেছনের সীমানা প্রাচীরের দুই জায়গায় ভেঙে ফেলা হয়। পরে সেখান থেকে গুলি করলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
“নতুন যে ক্যাম্প বানানো হচ্ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছিল। সেই ক্যাম্পটাতে তারা ভাঙচুর করেছে এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করেছে।”
খবর পাওয়ার পরে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করে জানিয়ে র্যাব-৭ অধিনায়ক বলেন, “আসার পরে দেখলাম যে রাস্তায় বেশ কিছু কালভার্টের সামনে বড় বড় ডিচ করে রেখেছে। যাতে আমরা যাতে গাড়ি নিয়ে আসতে না পারি।
“পরে গাড়ি রেখে আমরা হেঁটে চলে এসেছি। যখন এসেছি ততক্ষণে তারা বেশিরভাগই পালিয়েছে। কিছু সন্দেভাজনকে আমরা পেয়েছি। জিজ্ঞাসাবাদ করছি। সম্পৃক্ততা পেলে গ্রেপ্তার করা হবে। না হলে ছেড়ে দেব।”
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “আলীনগর এলাকায় আমাদের নতুন যে ক্যাম্পটা করা হচ্ছিল ওটার প্রতি তাদের বিশেষ নজর ছিল। সেটা তারা ভাঙার জন্য এক্সক্যাভেটর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে এসেছিল। কিছু অংশ তারা ভেঙেও ফেলেছে।”
আলী নগর স্কুলের ক্যাম্পে পুলিশ, র্যাব, আরআরএফ ও এপিবিএনসহ মোট ১৫০ জন সদস্য ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সদস্যরা যারা আলী নগর স্কুলে ছিল, তারা যাতে প্রটেক্ট করতে না পারে, ওটা যাতে তারা নির্বিঘ্নে করতে পারে, সেজন্য এখানে এসে গোলাগুলি করে।
“আমাদের যারা সদস্য ছিল তারা শক্তভাবে প্রতিরোধ করেছে। পুলিশেরই প্রায় ১০৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া লাগছে। সাথে সাথে আমরাও মুভ করেছিলাম। শক্ত প্রতিরোধের কারণে তারা দ্রুত এখান থেকে সরে যায়। পাহাড়ের দিকে চলে যায়। আমরা এসে ওদেরকে পাইনি। ওদের রেখে যাওয়া এক্সক্যাভেটর, ভেকু মেশিন, ট্রাক, দুটি মোটর সাইকেল আমরা জব্দ করেছি।”
চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল ছলিমপুরে অভিযানে যায়। সেখানে ‘মাইকে ঘোষণা’ দিয়ে র্যাব সদস্যদের ঘিরে তিনজনকে আটকে ফেলে স্থানীয়রা। তাদের পিটুনিতে নিহত হন র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
এরপর গত ৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তিন হাজার ১৮৩ জন সদস্যকে নিয়ে সেখানে অভিযানে যায় স্থানীয় প্রশাসন। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৪৮৭, বিজিবি ১২২ জন, র্যাবের ৩৭১ জন সদস্য ছিলেন। তিনটি হেলিকপন্টার, ১৫টি এপিসি, ডগ স্কোয়াড, ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয় অভিযানে।
দীর্ঘ ৪ দশক ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য ও “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র” হিসেবে পরিচিত এই ৩,১০০ একর সরকারি পাহাড়ি এলাকাটি সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সন্ত্রাসীদের হামলার আইনশৃঙ্খলার ক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের অংশ নিয়ে চট্টগ্রাের পুলিশ সুপার মাসুদ আমল সাংবাদিদের বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশের ভেতরে সন্ত্রাসীদের আর একটি দেশ আমরা বানাতে দেবোনা। এই জঙ্গল সলিমপুর থেকে এই সব সশস্ত্র সন্ত্রাসী, খুনি ও ভূমিদস্যুদের নাম নিশানা পুরোপুরি নির্মূল করা হবে । যৌথ বাহিনীর এই সাঁড়াশি অভিযান চলছে।
আগামী ৩০ মে পুলিশের আইজির এলাকাটি পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে। তার আগেই নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অপরাধ সাম্রাজ্য ফিরে পেতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় দেখাতেই ইয়াসিন বাহিনী এই হামলা করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ভেঙে ও রাস্তা কেটে সরাসরি রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার এই দুঃসাহস কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
