বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

খাগড়াছড়িতে চার হত্যার ঘটনায় মামলা

এলাকায় শোকের মাতম-মানুষের মনে আতঙ্ক

শংকর চৌধুরী, খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির সিমান্তবর্তী পানছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ’র) চার নেতা গুলি করে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত বিপুল চাকমার চাচা নিরুপম চাকমা বাদী হয়ে ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করে বুধবার ১৩ ডিসেম্বর পানছড়ি থানায় মামলাটি করেছেন বলে জানিয়েছেন, পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আজম।

বুধবার খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর হরা হয়েছে বলেও জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।

সোমবার ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারত সিমান্তবর্তী পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের দুর্গম অনিল পাড়ায় প্রসীত বিকাশ খীসা সমর্থীত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি’র) সাবেক কেন্দ্রিয় সভাপতি ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’র কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিপুল চাকমা, পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সুনীল ত্রিপুরা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’র খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সহ-সভাপতি লিটন চাকমা ও ইউপিডিএফ সদস্য রুহিন বিকাশ ত্রিপুরাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

পরে মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহত চারজনের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এ ঘটনার পর থেকে ইউপিডিএফ সংগঠক নীতি দত্ত চাকমা, হরি কমল ত্রিপুরা ও সদস্য প্রকাশ ত্রিপুরা নিখোঁজ রয়েছে।

ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা জানিয়েছেন, ‘মঙ্গলবার সেখানে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের উদ্যোগে যুব সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। সম্মেলনে যোগ দিতে তারা সেখানে অবস্থান করছিলেন। রাতে তাদে উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা কার হয়। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কে দায়ী করেছে ইউপিডিএফ। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সভাপতি শ্যামল চাকমা।

প্রতিহিংসার বুলেটে নিদ্বিধায় কেড়ে নিচ্ছে এক ভাই অন্য স্বজাতি ভাইয়ের প্রাণ। মুহুর্তেই খালি হচ্ছে কোনোনা কোনো মায়ের বুক। কোনো মতেই বন্ধ হচ্ছে না খুনাখুনি এ রক্তের খেলা। কবে শান্ত হবে সবুজ পাহাড়ে সমাদৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ঝরছে রক্ত। খুন, গুম, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা এখানে যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব কারণে পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক। আদিপত্যের এই লড়ায়ে টিকে থাকতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (শান্তি চুক্তি) পর অকালে প্রাণ গেছে প্রায় কয়েক হাজার যুবকের। এপর্যন্ত কত মায়ের বুক খালি হয়েছে পুলিশের কাছে তার কোনো পরিসংখ্যানও নেই। এসব ঘটনার বেশিরভাগই মামলা হয় না বললেই চলে।

সবুজ পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের লক্ষে অস্ত্র সমর্পনের মধ্যদিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা’র) সাথে সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলেও চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রসীত খীসার নেতৃত্বে, ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠন করা হয়।

ইউপিডিএফ গঠনের পর ফের শুরু হয় পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার ও রক্তের খেলা। লড়াই শুরু হয় জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে। এলাকা নিয়ন্ত্রণে জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যে অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের প্রায় হাজার খানেক নেতাকর্মী প্রাণ হারায়।

এর এক পর্যায় ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতিতে ফাটল ধরে। তখন সেখান থেকে বেরিয়ে ২০১০ সালে তাতিন্দ্রলাল চাকমা (পেলে), সুধাসিন্ধু খীসা ও শক্তিমান চাকমাসহ মিলে গঠন করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) জেএসএস (সংস্কার) নামে আরও একটি নতুন রাজনৈতিক দল। যেহেতু এ দলটি সন্তু লারমার কাছ থেকে সরে গিয়েই গঠিত হয়েছে, সেই হিসেবে ইউপিডিএফ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে।
এরই মধ্যে ২০১৭ সালে আবার প্রসীত খীসা নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ’র বিদ্রোহী একটি অংশ তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা) নেতৃত্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে পৃথক আরেকটি দল গঠন করে। জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) মিলে তৈরি হয় নয়া মেরুকরণ। পূর্বের হিসাব-নিকাশ উল্টে গিয়ে এবার ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কার) এক হয়ে যায়।

অন্যদিকে, বিদ্রোহীদের গায়েল করতে দীর্ঘদিনের দুই শত্রু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা) এবং প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেতরে ভেতরে অনেকটা সন্ধি হয়। যদিও প্রকাশ্যে বিষয়টি তারা অস্বীকার করে।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠনের পর ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ মূল ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই শীর্ষ নেত্রীকে অপহরণ করার অভিযোগ ওঠে তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা’র) নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর ওপর।
অপহরণের প্রায় ৩২ দিন পর ওই দুই নেত্রী মুক্তি পেলেও এ ঘটনায় তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মার) ওপর চরম ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে ইউপিডিএফ। ওই সময় ইউপিডিএফের প্রায় ৮-১০ জন নেতাকর্মী খুন হন। এসব খুনের ঘটনায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কে দোষারোপ করা হয়।

একপর্যয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকি থাকার লড়াইয়ে দয়াসোনা চাকমা ও মন্টি চাকমার অপহরণ মামলার প্রধান আসামি, জেএসএস (এমএনলারমা) অংশের নেতা ও রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করা হয়। এতে ফের অশান্ত হয়ে ওঠে পাহাড়। পরদিন নিহত শক্তিমান চাকমার অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সীমান্তের কাছে বেতছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা) সহ পাঁচজনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে দৃর্বৃত্তরা। শক্তিমান চাকমাকে খুনের রেশ না কাটতেই ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে প্রাণ যায় আরও পাঁচজনের।

ওই সময় ২৪ ঘন্টার মধ্যে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (এমএনলারমা) দুই পক্ষই প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফকে দায়ী করেছিল। তবে তা দোষারোপের মধ্যেই থেমে থাকেনি। এরপর নানা রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমীকরণ আর বিভেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সহিসতায় বারবার ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে পাহাড়, ঝরেছে আরও অনেক তাঁজা প্রাণ।

পাহাড়কে উথাল-পাথাল করে দেওয়া এমন অনেক ‘অশান্ত’ ঘটনাবলীর মধ্যেই, সোমবার ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারত সিমান্তবর্তী পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের দুর্গম অনিল পাড়ায় ইউপিডিএফের চার নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় আরও তিনজনকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই তিনজনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিয়ে অন্ধকারে স্বজনরা।

বিপুল চাকমা, সুনীল ত্রিপুরা, লিটন চাকমা ও রুহিন বিকাশ ত্রিপুরার মৃত্যুর ঘটনায়, এলাকায় শোকের মাতম। কোনো মতেই কাটছে না মানুষের মনের আতঙ্ক, কখন আবার কি হয়।

পাহাড়ের এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো মামলা করা হয় না। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও এসব মামলার কোনও সুরাহা পাওয়া যায়না।

বন্দুকের নলে রক্তের খেলা বন্ধ হোক। যেকোনও মূল্যে শান্ত করা হোক সবুজ পাহাড়। পার্বত্যাঞ্চলে সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক। পাহাড়বাসী শান্তি চাই।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

বান্দরবানের আলীকদমে যৌথ অভিযানে ৩৩৯ রাউন্ড গুলিসহ আটক ১

বান্দরবানের আলীকদমে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে ৩৩৯ রাউন্ড...

অভিমানী কিশোর মুগ্ধকে পাওয়া গেল লালদীঘির পার্কে ঘুমন্ত অবস্থায়

এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পেরে ঘরে মায়ের কাছে...

চৌদ্দগ্রামে পৃথক ঘটনায় গৃহবধূসহ তিনজনের মৃত্যু

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ, সড়ক দুর্ঘটনা ও সাপের কামড়ে গৃহবধুসহ...

টেকনাফে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত

কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়েতে ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত...

চুয়েটের পুকুরে গোসলে নেমে আবারও দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুকুরে গোসল করতে...

চট্টগ্রামে এসএসসিতে শতভাগ পাশের গৌরব অর্জন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার (২০২৬ সালের) প্রকাশিত...

আরও পড়ুন

বান্দরবানের আলীকদমে যৌথ অভিযানে ৩৩৯ রাউন্ড গুলিসহ আটক ১

বান্দরবানের আলীকদমে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে ৩৩৯ রাউন্ড আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিসহ মাংরুম ম্রো (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দিবাগত রাত...

অভিমানী কিশোর মুগ্ধকে পাওয়া গেল লালদীঘির পার্কে ঘুমন্ত অবস্থায়

এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পেরে ঘরে মায়ের কাছে ‘ক্ষমা চেয়ে চিঠি’ লিখে বের হয়ে যাওয়া অভিমানী কিশোর প্রাচুর্য দাশ মুগ্ধেকে (১৬) দুইদিন পর...

চৌদ্দগ্রামে পৃথক ঘটনায় গৃহবধূসহ তিনজনের মৃত্যু

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ, সড়ক দুর্ঘটনা ও সাপের কামড়ে গৃহবধুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন, মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বাসন্ডা গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক গোলাম সারোয়ারের স্ত্রী বিলকিছ...

টেকনাফে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত

কক্সবাজার-টেকনাফ হাইওয়েতে ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে টেকনাফের কেরুনতলী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।নিহতরা হলেন—উখিয়ার পালংখালী...