রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগরের সৌদি আরব প্রবাসী মানিক হোসেন গত ৬ মাস ধরে সৌদি আরবে নিখোঁজ। তার লালখান বাজারে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এই ফ্ল্যাটে থাকেন মানিকের স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
গত ৬ মাস ধরে মানিকের কোন খোঁজ-খবর পাননি তার পরিবার। নিজের থেকেও পরিবারের ছেলে-মেয়ে এবং স্ত্রীর কোন খবর নেননি তিনি।
গত ৬ মাস ধরে মানিক হোসেন নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন নাকি তাকে অপহরণ করা হয়েছে সোমবার (১৬ জানুয়ারি) তাকে উদ্ধারের পরও দুইপক্ষের বক্তব্যে হিসাব মেলাতে পারছেননা পুলিশ।
অপহৃত বা আত্মগোপনে থাকা সৌদি আরব প্রবাসী মানিক হোসেনকে সোমবার (১৬ জানুয়ারি) দুপুরে ষ্টেশন রোডস্থ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল সৈকত থেকে উদ্ধার করেছে খুলশী থানা পুলিশ।
এসময় পুলিশ আরো দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। পরিবারের অভিযোগ মানিককে সৌদি আরব থেকে জিম্মি করে দেশে এনে-হোটেলের রেখে তার ফ্ল্যাটটি রেজিষ্টি করে নেয়া হয়েছে। অপরদিকে পুলিশ হেফাজতে মানিক বলেছেন-তিনি দেনান দায়ে তার ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন। উভয়ের বক্তব্যে রীতিমত ধাধায় পড়েছেন পুলিশ।
এই ব্যাপারে খুলশী থানার অফিসার ইনর্চাজ (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, আসলে মানিক হোসেন নামে যে ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়েছে সেই ব্যক্তিকে আমরা উদ্ধার করে থানায় এনেছি। ঐ ব্যক্তি আমাদেরকে জানিয়েছেন, তিনি অপহৃত হননি।
সৌদি আরবে থাকা অবস্থায় তার অনেক গুলো টাকা ঋণ হয়েছে। তখন তিনি তার শ্বশুড় বাড়ির কাছে বারবার সহযোগিতা চেয়েছেন। তখন কারো সহযোগিতা না পেয়ে তিনি পরিবারের কারো সাথে যোগাযোগ না করে দেশে এসে তার লালখান বাজারের ফ্ল্যাটটি পাওনাদারের কাছে বিক্রি করে দিয়ে আত্মগোপন করে থাকে বলে আমাকে জানিয়েছে।
কিন্তু তার কথাও আমরা মিলাতে পারছিনা। একজন লোক সৌদি আরব থেকে দেশে আসলো। দেশে এসে পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ না করে তার নিজের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে আত্মগোপন করে থাকা। আর সৌদি আরব থেকে আসার জন্য ফ্লাইট ভাড়া কে দিয়েছে? কে এনেছে ? এখানে এসে আত্মগোপন করে থাকা, হোটেল ভাড়া দিয়ে কিভাবে হোটেলে আছেন ? এসব বিষয় গুলোর আমরা হিসেব মিলাচ্ছি।
ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা আরো বলেন, আমাদের কাছে মানিক হোসেনের পরিবারের পক্ষ থেকে গত রবিবার তাদেরকে হুমকি-ধমকি দেয়ার একটি জিডি করা হয়েছে। এই জিডির সূত্র ধরেই আমরা সোমবার মানিক হোসেনকে হোটেল থেকে উদ্ধার করেছি।
তিনি আমাদের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন-তার সাথে পরিবারের অভিযোগ গুলোর মিল নেই। তারপরও আমরা উভয়ের বক্তব্য শুনে বুঝতে পারবো-আসলে কি ঘটনা।
টাকা-পয়সা পাওনাদার থাকলেও এতোদিন ধরে তার ছেলে-মেয়ে এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ না করে, আত্মগোপন করে থাকাটা কেমন যেন মনে হচ্ছে। এখনো বিষয়টি আমাদের কাছে পরিস্কার হয়নি। আমরা উভয়ের সাথে কথা বললে বুঝতে পারবো।
সৌদি প্রবাসী মানিক হোসেনের ভায়েরা অ্যাডভোকেট ইসমাইল গনি বলেন, মানিক হোসেন গত ৬ মাস ধরে সৌদি আরব থেকে নিখোঁজ। এই ৬ মাস ধরে আমরা তার কোন খোঁজ খবর পাচ্ছিনা। তিনিও পরিবারের সাথে কোন ধরনের যোগযোগ করেননি। গত কিছু দিন আগে আমরা জানতে পারি মানিক হোসেন দেশে এসেছেন।
দেশে এসে তিনি তার লালখান বাজারের ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিয়েছেন এবং যারা কিনেছেন তাদের নামে নামজারীও হয়ে গেছে। আসলে এরা একটি বড় মাফিয়া চক্র। এই চক্রের সদস্যরা সৌদিয়ায়ও আছে-দেশেও আছে। তারা সৌদি আরব থেকে মানিককে জিম্মি করে বিমানে দেশে এনে হোটেলে রেখে, ফ্ল্যাটটি রেজিষ্ট্রে করে-নামজারিও করে নিয়েছে।
যারা ফ্ল্যাটটি কিনেছেন বলে দাবি করেছেন তারা বেশ কিছুদিন ধরে মানিক হোসেনের স্ত্রীকে ফোন করে ফ্ল্যাটটি ছেড়ে দিতে হুমকি দেন। এসময় মানিক হোসেনের স্ত্রী তাদের কাছে জানতে চান-তার স্বামীতো সৌদি আরবে। তিনি কবে দেশে আসলেন? এসময় অপহরনকারীরা জানান, মানিক হোসেন সৌদি আরব থেকে দেশে এসে ফ্ল্যাটটি আমাদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে আবার চলে গেছে।
এরপর অপহরনকারীরা লালখান বাজারে মানিক হোসেনের যেখানে ফ্ল্যাট আছে-সেখানকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির কাছে মানিক হোসেনের ফ্ল্যাটটি কিনে নেয়ার কাগজপত্র দিয়ে যান।
তাদের একজনের সাথে আমি কথা বললে-তারা আমাকেও একই কথা বলেন এবং ফ্ল্যাটটি ছেড়ে দেয়ার জন্য হুমকি দেন। তাদের কথা-বার্তায় আমার সন্দেহ হলে এই ব্যাপারে আমরা খুলশি থানায় জিডি করি।
পুলিশ এই সূত্র ধরে আজ সোমবার দুপুরে হোটেল সৈকত থেকে অপহৃত মানিক হোসেনকে উদ্ধার করে একই সাথে মনির মোল্লাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করে। এই চক্রটি গত ডিসেম্বরে মানিক হোসেনকে সৌদি আরব থেকে জিম্মি করে দেশে এনেছে।
দেশে এনে হোটেল সৈকতে রেখেছে। গত ৪ জানিয়ারি ফ্ল্যাটটি রেজিষ্টি করে নিয়েছে। মানিক হোসেনের ২ মেয়ে ও ১ ছেলে রয়েছে। মানিক হোসেনের গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগরে।
