বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

কেপিএমে অবিক্রীত ৪০ কোটি টাকার ৪ হাজার টন কাগজ

মোহাম্মদ ইমরান হোসেন, রাঙ্গুনিয়া

দেশে কাগজ সংকট ও কাগজের বাজারে দাম চড়া হলেও বিক্রি না হওয়ায় প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন কাগজের স্তুপ পড়ে আছে এক সময়ের দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) এর গুদামে।

বছরের পর বছর লোকসানে জর্জরিত এ কাগজ কলটি লাভ তো দূরের কথা উৎপাদিত কাগজের খরচও তুলতে না পেরে দিনে দিনে কেবল বাড়িয়েছে দেনা। মিলের অবস্থাও নাজুক, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আছে। যন্ত্রাংশগুলো জরাজীর্ণ হয়ে বিকল হওয়ার পথে। আর্থিক সংকট ও পাল্প সংকটসহ নানা কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কাগজ অবিক্রীত থাকায় গুদামে পড়ে রয়েছে আগের উৎপাদিত প্রায় ৪ হাজার টন কাগজ। যার বাজার মূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

এদিকে কাগজ উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বন্ধ নেই কেপিএমের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন। বিসিআইসির ঋণের টাকায় চলছে কেপিএম, শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সবই আসছে এই ঋণের টাকা থেকে। এছাড়াও বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ীভাবে ৩৯ জন কর্মকর্তা, ৩৯ জন কর্মচারী, ৮২ জন শ্রমিক ও অস্থায়ী শ্রমিকসহ সবমিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন কর্মরত আছে। তাদের সবার বেতন-ভাতাসহ প্রতিষ্ঠানটির মাসিক লোকসান গুণতে হয় প্রায় ৫ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে কেপিএম ঘুরে দেখা গেছে, উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যন্ত্রাংশগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে বিকল হওয়ার পথে। টারবাইনও নষ্ট। কাগজের গুদামে দেখা গেলো যত্রতত্র পড়ে রয়েছে কাগজ। একপাশে এনসিটিবির ছাপানো বই ছিঁড়ে মন্ড বানানোর জন্য স্তুপ করে রাখছে শ্রমিক আবদুল মান্নান, তিনি জানান এনসিটিবি থেকে পুরনো অতিরিক্ত এই ছাপানো বইগুলো আনা হয়েছে মন্ড বানানোর জন্য। কাগজের গুদামের সামনে এগিয়ে গেলে ছবি তুলতে বাঁধা দেন লিটন নামের ওই গুদামের স্টোরকিপার লিটন, তিনি জানান কেপিএমের ভিতরে কাগজের ও যন্ত্রাংশের ছবি তোলা যাবেনা। তবে গুদামে কি পরিমাণ কাগজ আছে তা জানতে চাইলে লিটন বলেন, এখানে প্রায় ৪ হাজার টন মতো উৎপাদিত কাগজ রয়েছে।

কেপিএমে শ্রমিক-কর্মচারীরা জানান, আগে মিলের কাঁচামাল হিসেবে বাঁশ-কাঠের ব্যবহার হলেও ২০১৭ সাল থেকে নানা কারণে বাঁশকাঠ দিয়ে কাগজ উৎপাদন বন্ধ করে কেপিএম। এরপর থেকে পুরোনো কাগজ ও পাল্প আমদানি করে কাগজ উৎপাদন করার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সেই থেকে এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারেনি কেপিএম। এখন অবশ্য লোকসান গুণতে গুণতে ঋণে জর্জরিত কেপিএম।

তবে মিল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোনো যন্ত্রপাতিসহ অনেকগুলো মেশিন অকেজো হয়ে যাওয়ায় নতুন প্ল্যান্ট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলছে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কর্ণফুলী পেপার মিলের উপ প্রধান রসায়নবিদ (অতিঃ) শামীম আহমেদ বলেন, “টারবাইনের সমস্যার কারণে মূলত কাগজ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মিলও অনেক তবে বিসিআইসি থেকে নতুন মিলের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে”।

কর্ণফুলী পেপার মিল সিবিএ সভাপতি আবদুর রাজ্জাক  বলেন, আমাদের নিজস্ব মন্ড বানানোর মেশিন নষ্ট ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পাল্প আমদানি করে কাগজ উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পাল্প সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ। মিলে উৎপাদিত যে ৪হাজার টন মতো কাগজ অবিক্রীত রয়েছে তা গত ২বছর আগের। এখন অবশ্য বিসিআইসি থেকে ঋণ নিয়ে কারখানার কর্মকর্তা-শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেপিএম সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু নজরদারির অভাব, লাগামহীন দুর্নিতী, অব্যবস্থাপনা, এনসিটিবির কাগজ কেনায় অনীহা, অনিয়ম ও উৎপাদিত কাগজের প্রায় ৪হাজার টন কাগজ অবিক্রিত থাকায় এযাবত প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১২শত কোটি টাকারও বেশি। এরিমধ্যে গেলো ২ বছরের উৎপাদিত অবিক্রিত কাগজ যদি বিক্রির অভাবে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আর্থিক এ লোকসানের পরিমাণ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার আশংকাও রয়েছে।

এছাড়াও আগে “এনসিটিবি” গড়ে বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন কাগজ ক্রয় করলেও গত ২বছর যাবত কোনো কাগজ ক্রয় করেনি তাঁরা। তবে এনসিটিবি কাগজ না কিনলেও কেপিএমে মন্ড বানানোর জন্য ঠিকই পুরনো বই পাঠান এনসিটিবি, এতে অবশ্য কেপিএম কর্তৃপক্ষেরও আগ্রহ আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেপিএমের আরেক কর্মকর্তা জানান, এনসিটিবি কাগজ কেনা ও ছাপানো দুটোই একই প্রতিষ্ঠান থেকে করতে চায় তাই কেপিএম থেকে কাগজ নিচ্ছেনা। তাদের জন্য যে কাগজ বানানো হয়েছে তা এখনও অবিক্রীত থেকে গেছে। এনসিটিবি যদি তাদের মোট কাগজের চাহিদার অন্তত ৫০ শতাংশ কাগজও ক্রয় করে তাহলে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আশা, কেপিএম সংশ্লিষ্টদের।

কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী স্বপন কুমার সরকার  বলেন, “কেপিএমে আগে কাগজ বিক্রি হতোনা, এখন কাগজ বিক্রি হচ্ছে। পাল্প উৎপাদন বন্ধ, ডলারের দাম বৃদ্ধি ও পাল্পের সংকটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও পাল্প আমদানি করা কঠিন হয়ে গেছে। এখনও প্রায় ৩হাজার টন মতো কাগজ আছে। এছাড়া অর্ডার থাকলে আমরা কাগজ তৈরি করি। তবে এখন টারবাইন নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে”।

১৯৫৩ সাল থেকে কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) দৈনিক ১০০ মেট্রিক টন উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর উৎপাদন সক্ষমতা কমে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে বলেও দাবী জানান কেপিএম কর্তৃপক্ষের। লোকসানের পরিমাণ কমিয়ে আর্থিক সংকট গোছাতে সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা থাকলেও গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা মেনে কেপিএম থেকে কাগজ ক্রয় করলেও বেশিরভাগ সংস্থা দুর্নীতি ও আমলা জটিলতার কারণে সেটি মানছে না।

এছাড়াও দীর্ঘদিন লোকসানে জর্জরিত হয়ে ধুঁকে গভীর সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানের ঋণের পাশাপাশি ঠিকাদারের বিলও পরিশোধ করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত কাগজ উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠানটি।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম) সূচনালগ্ন থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ও আশেপাশের বসবাসরত মানুষের জন্য বিশাল একটা অংশের কর্মসংস্থানের যোগান দিয়ে আসছে।

এদিকে বিগত ২০১৬ সালের পর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাঁচামাল হিসেবে বাঁশ-কাঠের প্রচলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে এযাবত বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করেই কাগজ উৎপাদনে গেলো এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু উৎপাদিত কাগজ অবিক্রীত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। দিনের পর দিন দেনা বাড়িয়ে চলছে।

তবে চলমান সংকট নিরসনে নতুন মিল স্থাপনের বিকল্প নেই। সরকারের তরফ থেকে আর্থিক অনুদান ও নানামুখি সমস্যার পাশাপাশি নতুন মিল স্থাপনে সরকারের একান্ত হস্তক্ষেপে কেপিএমের সৃষ্ট এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি বৃহৎ একটা অংশের মানুষের কর্মসংস্থানের যোগান সম্ভব বলেও জানান কেপিএম কর্তৃপক্ষ।

প্রসঙ্গতঃ তৎকালীন পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক রাঙামাটি জেলা কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে।

শিল্প আইনের অধীনে নিবন্ধিত প্রথম কাগজশিল্প যা ৩০ হাজার শ্রমিক নিয়ে এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজ-কল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মিলটি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন এবং ইতালির সহযোগিতায় ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় স্থাপিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যমাত্রা ছিল বার্ষিক ৩০ হাজার মেট্রিক টন।১৯৫৩ সালের ১৬ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। শুরুতে ব্যবস্থাপনা ত্রুটি থাকায় ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার দাউদ গ্রুপের নিকট কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়। এরপর তারা এটির আধুনিকায়নের কাজ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা এটি অধিগ্রহণ করে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল চট্টগ্রামনিউজ.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, মতামত, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি । আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@chattogramnews.com ঠিকানায়।

সর্বশেষ

বোয়ালখালীতে জমির বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরার ইউনিয়নের ঘোষখীল গ্রামে জায়গা জমির...

হালিশহরে গামছা পেঁচিয়ে সাত বছরের শিশুকে হত্যার দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থানা এলাকায় গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ...

সেবাপ্রত্যাশীদের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে: সিএমপি কমিশনার

চট্টগ্রাম নগরবাসীর অভিযোগ ও সমস্যার দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে জনবান্ধব...

আকবরশাহে বাসা থেকে চুরি: ১০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার, দুইজন গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম মহানগরের আকবরশাহ থানাধীন বিশ্ব কলোনি এলাকায় একটি বাসা...

দেশীয় প্রযুক্তির অক্সিজেন মেশিন তৈরিকারকদের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুতকারকদের...

মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে...

আরও পড়ুন

বোয়ালখালীতে জমির বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরার ইউনিয়নের ঘোষখীল গ্রামে জায়গা জমির বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের আঘাতে বড় ভাই নিহত হয়েছেন। নিহত নেজাম উদ্দিন (৪৫) ঘোষখীল গ্রামের...

হালিশহরে গামছা পেঁচিয়ে সাত বছরের শিশুকে হত্যার দায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থানা এলাকায় গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে সাত বছরের শিশু মাহফুজকে হত্যা মামলায় আসামি মো. আল আমিন নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড...

আকবরশাহে বাসা থেকে চুরি: ১০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার, দুইজন গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম মহানগরের আকবরশাহ থানাধীন বিশ্ব কলোনি এলাকায় একটি বাসা থেকে ১২ ভরি স্বর্ণ চুরির ঘটনায় জড়িত শাহ আলম (৩০) ও মো. মনির হোসেন (২৮)...

সরকারের পাশাপাশি জেলা পরিষদও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কাজ করবেন:  জেলা প্রশাসক শামীম

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সহযোগিতা...