অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক( এডিসি) হিসেবে পদোন্নতি লাভ করায় বিদায় লগ্নে কাঁদলেন এবং কাঁদালেন বিদায়ী আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জোবায়ের আহমেদ। তাঁর এই বিদায় বেলায় আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, কর্মচারী, আনসার সদস্য, উপজেলার সাধারণ মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়ে তাকে বিদায় জানান।
মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় তাঁর কাননে কুসুমকলি বাসভবন থেকে নতুন কর্মস্থল গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্য রওনা হওয়ার আগে তাঁর সহকর্মীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ফুল ছিটিয়ে তাকে বিদায় জানান।

সবার চোখের পানি দেখে ইউএনও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। নিজের হাতে গড়া নান্দনিক সৌন্দর্যে ঘেরা উপজেলা পরিষদের মায়া কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিদায় বেলায় উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে কর্ণফুলীর ক্রসিং মোড় পর্যন্ত মোটরসাইকেল বহর যোগে ইউএনওকে এগিয়ে দিয়ে আসেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ।
ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দক্ষতার সঙ্গে তা পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন তিনি।
এর আগে সোমবার ( ২৩ জানুয়ারি) রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জোবায়ের আহমেদের গোপালগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে পদোন্নতি জনিত বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে আনোয়ারা উপজেলা অফিসার্স ক্লাব।

উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবর্ধনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন শেখ জোবায়ের আহমেদের বাবা ও মা।
এতে উপজেলা সহকারী কমিশনার ( ভূমি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিনের সঞ্চালন উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৃণাল কান্তি ধর, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মরিয়ম বেগম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যাপক এমএ মান্নান চৌধুরী, আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ মির্জা মোহাম্মদ হাছান সহ উপজেলা সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সাংবাদিক জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বটতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এমএ মান্নান চৌধুরী বলেন, করোনা সংকটে দিন রাত মানুষের সচেতনতায় কাজ করে গেছেন । এমন কি নিজে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন দু’দুবার। ছুটিতে ও বাড়ি যাননি তিনি বলেছেন, “সবার জ্বর ছাড়লে আমি বাড়ি যাবো” । এই সময়ে লকডাউন নিশ্চিত, খাদ্য সরবরাহ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন এই ইউএনও। বিভিন্ন দূর্যোগে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে মোকাবেলা করেছেন। এর পরে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে দু’বার অর্জন করেছেন দেশ সেরা সম্মাননা। গড়েছেন নান্দনিক উপজেলা।
আনোয়ারা উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, মানবিক, সৎ ও সাহসী মানুষ শেখ জোবায়ের আহমেদ । তিন বছরের দায়িত্বে থাকা কালীন সময়ে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি উপজেলার বেশ কিছু উন্নয়ন মূলক প্রকল্প সুন্দর ভাবে সমাপ্ত করেছেন। তিনি সততা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি যেখানেই যাবেন সেখানেই তার যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ইউএনও শেখ জোবায়ের আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, বাবা ও মা আজ মঞ্চ উপস্থিত আছেন এইটা আজ আমার জন্য শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আমি আমার জীবনের একটি সোনালী অধ্যায় শুরু করে ছিলাম। “যেখানে যতটুকু, চেষ্টা করেছি মানুষের উপকারে কাজ করার জন্য। আপনাদের চোখের কোনায় যে ভালোবাসা ছিলো সেটা বুঝতে পারিনি। আনোয়ারা আমার নিজের বাড়ির মত ছিলো । আপনাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি আনোয়ারার মানুষের ভালোবাসা আমার পাওয়া।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারীতে আনোয়ারা উপজেলা ইউএনও হিসেবে যোগদানের পর সর্বদাই তিনি নিজের সেরাটা দিয়ে প্রশাসনের সব কাজের পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করেছেন বিরামহীনভাবে। এছাড়া বাধা উপেক্ষা করে তিনি সাহসিকতার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিশীল ও ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞ করে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। এ কারণে অল্প সময়ে সর্বমহলে প্রশংসিত হন শেখ জোবায়ের আহমেদ।তার নেতৃত্বে তিন বছরে দুইবার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে দেশ সেরা উপজেলা হয়েছে আনোয়ারা। এছাড়াও উপজেলায় স্মৃতি সৌধ, শহীদ মিনার, জাতির জনক বঙ্গবঙ্গু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, খেলা মাঠ ভরাট, বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু স্মৃতি মিনি শিশু পার্ক ও শৈল্পিক পুকুর ঘাট নির্মাণ ও বৃক্ষ রোপণ করে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছেন পুরো পরিষদ চত্বরকে। করোনাকালীন সময়ে সাহসী পদক্ষেপের কারণে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।
শেখ জোবায়ের আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে অধ্যায়ন শেষ করেন । এর ৩১তম বিসিএস প্রশাসনে যোগদান করেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারী থেকে ২০১৬ সালের ২৬ এপিল সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কশিনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ২০১৬ সালের ২ মে থেকে ২৮ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে সহকারি কমিশনার, ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৫ এপ্রিল ২০১৭ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যলয়ে সহকারী কমিশনার, ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ৭ জুন পাহাড়তলী কাট্টলী সার্কেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি), ২০১৮ সালের ১০ জুন থেকে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
