সোমবার ভোরে বাড়িতে পৌঁছায় ইব্রাহিমের মরদেহ। তখন বাড়িতে চলছিল শোকের মাতম। দাফনের আগপর্যন্ত ফ্রিজিং গাড়িতেই রাখা হয় ইব্রাহিমের মরদেহ। গাড়ির সাদা কাচের ওপর দিয়েই লাশের মুখে হাত বুলিয়ে বিদায় জানিয়েছেন স্বজনরা। পোড়া মরদেহ স্পর্শ করার সুযোগও ছিল না তাদের।
শোককে সঙ্গী করে নরসিংহপুর গ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিদায় দেন পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে নির্মমভাবে প্রাণ বিসর্জন দেয়া হত্যভাগ্য ইব্রাহিমকে।
সোমবার সকাল ১০টায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় আশপাশের গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
চ্ট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে নিহত ইব্রাহিম আরএফএল কোম্পানিতে ওই এলাকায় শিপিং সহকারী পদে চাকরি করতেন। তিনি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের নরসিংহপুর গ্রামের আবুল কাশেম মুন্সীর ছোট ছেলে।
নিহত ইব্রাহীম হোসেনের মেজো বোন সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই ভিডিও করতিছিল। ভিডিও করতি করতি কী ছুইটে আইসে আমার ভাইয়ের মাথায় লাইগলো রে…। মা কয়ে চিল্লেন দিয়ে আর কথা কইনি রে…। আমার ভাই কী কইরে ফুরোয়ে গেলো রে..। ভাইতো আর আসবে নারে…।’
বারবার মূর্ছা যেতে যেতে ইব্রাহিমের মা দুলাপি বেগম বলেন, ওরে আল্লাহ রে…আমি কি করবো। তুমি আমার কি পরীক্ষা করতিছাও। তুমি আমার সন্তানরে ফেরায়ে এনে দাও আল্লাহ রে…। সে খুব আদরের। আমি কার নিয়ে বাঁচবো। ওর ঘরে যে পোয়াতি (অন্তঃসত্ত্বা) বউ রয়েছে। প্রথম বাপ হবে আমার ইব্রাহিম। সন্তানের মুখ দেখতে পেল না আল্লাহ রে…। আমি কি করবো। ওর জায়গায় তুমি আমারে নিতে পারলে না কেন! পাশেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে বাবা অবসরপ্রাপ্ত মাদরাসা শিক্ষক আবুল কাশেম।
আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ইব্রাহিমের মৃত্যুর খবরে গত দুই দিন ধরে প্রতিবেশী ও আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকজন তাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে স্ত্রী মুন্নি খাতুন যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। ভাই-বোনসহ অন্যান্য স্বজনদের ক্ষণে ক্ষণে গগণবিদারী আহাজারিতে চারপাশ ভারি হয়ে উঠেছে।
ইব্রাহিম একটি কোম্পানির এক্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের শিপিং সহকারী পদে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানের অন্য শাখায় কাজ করেন তার খালাতো ভাই নাজমুল হোসেন।
তিনি বলেন, শনিবার রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ইব্রাহিম আগুনে দগ্ধ হয়। তার আগে সে বাড়িতে মা, বাবা ও স্ত্রীসহ অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে। তার মাথার পেছনে ও পেটে আঘাত ও আগুন লাগে। মুখ, টি-শার্ট ও মোবাইল ফোন দেখে তাকে শনাক্ত করি। উদ্ধারের সময় তার ফোনটি সচল ছিল।
আরেক খালাতো ভাই শিমুল হোসেন বলেন, শনিবার রাতে অনেকের মতো ইব্রাহিমও অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। কিছু সময় পর হঠাৎ ডিপোর কনটেইনারগুলোতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে লাশ পাওয়া যায়। দেড় বছর আগে নিজ গ্রামেই বিয়ে করে সে। তার এমন মৃত্যুতে তার অনাগত এই সন্তানের কি হবে সেটাই ভাবছি আমরা। আল্লাহ যেন আর কারো এমন মৃত্যু না দেন।
