বাংলাদেশে ধর্ষণ নিয়ে কথা বললে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত একজন অপরিচিত পুরুষের ছবি আসে। রাস্তায়, কর্মস্থলে, গণপরিবহনে কিংবা কোনো নির্জন জায়গায় একজন নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, এমন ঘটনাই আমরা বেশি আলোচনা করি। কিন্তু যে জায়গাটিতে এই আলোচনা সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, সেটি হলো একটি পরিবারের ভেতর।
অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি স্বামী হন, তখন আমাদের ভাষা বদলে যায়। “স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার”, “সংসারের বিষয়”, “এগুলো বাইরে বলার কী আছে” কিংবা “স্বামীরও তো কিছু অধিকার আছে” ধরনের কথা শোনা যায়।
এই জায়গাটিতেই আমাদের থামতে হবে।
কারণ একজন নারী বিয়ে করার পর তাঁর শরীরের ওপর নিজের অধিকার হারান না।
বিয়ে একটি সম্পর্ক তৈরি করে। দায়িত্ব তৈরি করে। পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য তৈরি করে। কিন্তু বিয়ে কাউকে অন্য একজন মানুষের শরীরের মালিক বানায় না।
বিয়ের সঙ্গে সম্মতির সম্পর্কটি আমরা কেন ভুলে যাই?
দাম্পত্য জীবনে যৌন সম্পর্ক স্বাভাবিক। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও স্বাভাবিক। সমস্যা সেখানে নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন একজনের ইচ্ছাকে অন্যজনের ইচ্ছার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
একজন স্ত্রী কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যৌন সম্পর্ক চাইছেন না। কারণ হতে পারে অসুস্থতা, মানসিক চাপ, গর্ভাবস্থা, প্রসবের পর শারীরিক দুর্বলতা, ভয়, ক্লান্তি অথবা একেবারেই ব্যক্তিগত কোনো কারণ। কারণটি স্বামীর কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে না হলেও তাঁর “না” বলার অধিকারটি অস্বীকার করা যায় না।
একই কথা স্বামীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সম্মতি কোনো একবারের অনুমতি নয়। বিয়ের দিন দেওয়া সম্মতিকে জীবনের প্রতিটি দিনের জন্য স্থায়ী সম্মতি ধরে নেওয়া যায় না।
এই সাধারণ বিষয়টি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষায় এখনও যথেষ্ট জায়গা পায়নি।
সমস্যাটি শুধু আইনের নয়, মানসিকতারও
বাংলাদেশের অনেক পরিবারে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, ভালো স্ত্রী হতে হলে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে, সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে এবং অনেক কিছু সহ্য করতে হবে।
সংসার টিকিয়ে রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কি শুধু নারীর?
আর সেই সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য একজন নারীকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক মেনে নিতে হবে কেন?
আমরা যখন বলি, “স্বামীকে মানিয়ে চলতে হয়”, তখন অনেক সময় অজান্তেই এমন একটি ধারণা তৈরি করি যে স্ত্রীর ইচ্ছার চেয়ে স্বামীর ইচ্ছা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই পরিবর্তন দরকার।
একটি সুস্থ দাম্পত্যে স্বামী-স্ত্রী দুজনের ইচ্ছার মূল্য থাকবে। সেখানে ভালোবাসা থাকবে, ঘনিষ্ঠতা থাকবে, কিন্তু জোর থাকবে না।
ধর্মের নামেও কি প্রশ্ন করা যাবে না?
বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা উঠলেই বাংলাদেশে আরেকটি বিষয় সামনে আসে। কেউ কেউ ধর্মীয় ব্যাখ্যার কথা বলেন এবং দাবি করেন যে বিবাহের মাধ্যমে স্বামীর স্ত্রীর ওপর বিশেষ যৌন অধিকার তৈরি হয়।
এখানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং ধর্মের নামে প্রচলিত কোনো সামাজিক ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করা এক বিষয় নয়।
কোনো ধর্মের অনুসারী হওয়া কাউকে অন্য মানুষের ওপর জুলুম করার অনুমতি দেয় না। ইসলামসহ সব ধর্মীয় নৈতিকতার আলোচনায় ন্যায়, দায়িত্ব, সংযম ও মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কেউ যদি ধর্মের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ব্যবহার করে বলেন যে একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই “না” বলতে পারবেন না, তাহলে সেই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সমাজের অবশ্যই থাকা উচিত।
ধর্মীয় আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং ধর্মীয় বক্তব্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক মানবাধিকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে আরও দায়িত্বশীল আলোচনা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার: ধর্মের নাম করে কোনো নারীর ওপর জোরজবরদস্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ ঘোষণা করা যায় না।
বাংলাদেশের আইনও এই প্রশ্নের বাইরে নয়
বাংলাদেশের Penal Code, 1860-এর Section 375-এ ধর্ষণের সংজ্ঞার পাশাপাশি বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পর্কিত একটি exception রয়েছে। এই বিধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলে আসছে।
২০২০ সালে BLAST, BRAC, Manusher Jonno Foundation এবং Naripokkho এই exception-কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বৈবাহিক অবস্থার কারণে নারীদের যৌন সহিংসতা থেকে ভিন্ন মাত্রার আইনি সুরক্ষা দেওয়া সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই আইনি বিতর্ক আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
একজন নারী অবিবাহিত হলে তাঁর সম্মতি আইনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি বিয়ে করলেই কেন সেই সম্মতির গুরুত্ব কমে যাবে?
এটি শুধু আইনের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্র একজন বিবাহিত নারীকে কতটা স্বাধীন ও পূর্ণ নাগরিক হিসেবে দেখে, সেই প্রশ্নও।
“স্বামী তো” কথাটির বিপদ কোথায়?
“স্বামী তো” এই দুটি শব্দ বাংলাদেশের পারিবারিক সংস্কৃতিতে অনেক কিছু ক্ষমা করে দেওয়ার অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বামী মারলে বলা হয়, সংসারের ঝামেলা।
স্বামী অপমান করলে বলা হয়, রাগের মাথায় হয়েছে।
স্বামী জোর করলে বলা হয়, স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার।
এই স্বাভাবিকীকরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কারণ কোনো কাজ ঘরের ভেতরে ঘটলেই সেটি ব্যক্তিগত হয়ে যায় না। পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেও সহিংসতা- সহিংসতাই।
আমরা যদি স্বামীর শারীরিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করতে পারি, তাহলে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করতে আমাদের এত দ্বিধা কেন?
ভুক্তভোগী নারীর জন্য বাস্তবতা আরও কঠিন
একজন নারী স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলে শুধু আইনের মুখোমুখি হন না।
তাঁকে পরিবারকে বোঝাতে হয়।
সন্তানের কথা ভাবতে হয়।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়।
শ্বশুরবাড়ির চাপ সামলাতে হয়।
নিজের পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, সমাজ কী বলবে সেই ভয় থাকে।
অনেক নারী হয়তো জানেনই না যে তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটিকে যৌন সহিংসতা হিসেবে দেখা যায়।
কারণ তাঁকে সারাজীবন বলা হয়েছে, “স্বামীকে এসব দিতে হয়।”
এই জায়গায় সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন নারীকে যেমন তাঁর অধিকার জানতে হবে, তেমনি একজন পুরুষকেও বুঝতে হবে যে স্ত্রীর প্রতি তাঁর দায়িত্বের মধ্যে তাঁর সম্মতিকে সম্মান করাও রয়েছে।
শিশুবিবাহের সঙ্গে বিষয়টির সম্পর্কও উপেক্ষা করা যাবে না
বৈবাহিক ধর্ষণের আলোচনায় শিশুবিবাহের বিষয়টি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
একজন অল্পবয়সী মেয়ে যখন সামাজিক বা পারিবারিক চাপে বিয়েতে আবদ্ধ হয়, তখন নিজের অধিকার সম্পর্কে তার সচেতনতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হতে পারে।
তার ওপর যদি স্বামীর যৌন অধিকারকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তাই শিশুবিবাহ প্রতিরোধ, নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং বৈবাহিক যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।
একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির সমাধান সম্ভব নয়।
শুধু কঠোর আইন করলেই কি পরিবর্তন আসবে?
আইন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন একা যথেষ্ট নয়।
থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে একজন নারী যদি অপমানিত হন, আইন তাঁর জন্য বাস্তব নিরাপত্তা তৈরি করতে পারবে না।চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাহলে তিনি দ্বিতীয়বার সাহায্য চাইতে ভয় পাবেন।
আদালতে যদি ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা হয়, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়াই তাঁর জন্য আরেকটি মানসিক শাস্তিতে পরিণত হতে পারে।তাই আইন সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজন পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ।
প্রয়োজন নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা।
প্রয়োজন গোপনীয়তা রক্ষা।
প্রয়োজন ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করার সংস্কৃতি।
আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, পরিবারকে বুঝতে হবে যে “সংসার বাঁচানো” মানে সবকিছু সহ্য করতে বলা নয়।
পুরুষদেরও এই আলোচনার অংশ হতে হবে
বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলা পুরুষবিরোধী অবস্থান নয়।
বরং এটি পুরুষদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন রাখে।
একজন পুরুষ কি চান তাঁর স্ত্রী তাঁকে ভয় করুক?
নাকি তিনি চান তাঁর স্ত্রী তাঁকে বিশ্বাস করুক?
তিনি কি চান স্ত্রী বাধ্য হয়ে তাঁর সঙ্গে থাকুক?
নাকি নিজের ইচ্ছায় তাঁর সঙ্গে জীবন কাটাক?
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
ভালো দাম্পত্যে ক্ষমতা দেখাতে হয় না। সম্মতি আদায় করতে হয় না। ভয় দেখিয়ে ভালোবাসা পাওয়া যায় না।
পরিবর্তনটা কোথা থেকে শুরু হবে?
সম্ভবত আইন থেকে।
সম্ভবত স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে।
সম্ভবত পরিবার থেকে।
অথবা হয়তো একটি ছোট কথোপকথন থেকে।
একজন মা তাঁর মেয়েকে বলবেন, “বিয়ে হলেও তোমার শরীরের ওপর তোমার অধিকার থাকবে।”
একজন বাবা তাঁর ছেলেকে বলবেন, “তোমার স্ত্রী তোমার সম্পত্তি নয়।”
একজন শিক্ষক বলবেন, “সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়।”
একজন ধর্মীয় নেতা বলবেন, “ধর্মের নাম করে জুলুমকে বৈধতা দেওয়া যাবে না।”
একজন আইনপ্রণেতা বলবেন, “বিবাহিত নারীর অধিকারও রাষ্ট্র সমানভাবে রক্ষা করবে।”
এই কথাগুলো যত বেশি উচ্চারিত হবে, নীরবতার সংস্কৃতি তত দুর্বল হবে।
শেষ কথা
বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে কথা বলা সহজ নয়।
কারণ এটি আমাদের সমাজের খুব পরিচিত কিছু ধারণাকে প্রশ্ন করে। স্বামীর কর্তৃত্ব, স্ত্রীর দায়িত্ব, পরিবারের সম্মান, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, সবকিছুর সঙ্গেই এই প্রশ্নের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে।
কিন্তু কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হয় না।
বিয়ে কোনো নারীর স্বাধীনতা বাতিল করে না।
কাবিননামা কোনো মানুষের শরীরের মালিকানার দলিল নয়।
স্বামী হওয়া কোনো অপরাধের দায় থেকে স্বয়ংক্রিয় মুক্তি নয়।
আর একজন নারী যখন যৌন সম্পর্কে সম্মতি দেন না, তখন তাঁর সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা দাম্পত্যের শত্রুতা নয়।
বরং সেটিই পারস্পরিক সম্মানের শুরু।
বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যদি সত্যিই কথা বলতে চাই, তাহলে শুধু রাস্তায় নারীর নিরাপত্তা নয়, ঘরের ভেতর তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলতে হবে।
কারণ একটি সমাজের সভ্যতা শুধু তার রাস্তাঘাটে কতটা নিরাপদ তা দিয়ে মাপা যায় না।
কখনও কখনও সেটি বোঝা যায় বন্ধ দরজার ওপারে একজন নারী নিজের কথা বলতে পারছেন কি না, এবং তাঁর “না” বলার অধিকারকে তাঁর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা সম্মান করছে তা দিয়ে।
বিয়ের পরও একজন নারী মানুষ।
তাঁর সম্মতি আছে।
তাঁর সীমারেখা আছে।
এবং তাঁর শরীরের ওপর তাঁর অধিকার আছে।
লেখক: রুবাইয়া আক্তার, কর্পোরেট ফাইন্যান্স বিভাগের প্রধান (রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ।
