প্রকৃতিতে এবার বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টিপাত অনেকটা স্বাভাবিক। বাংলায় চিরচেনা বর্ষার রূপ এ বছর ভালই দৃশ্যমান। বিগত কয়েক বছর যাবৎ আষাঢ় মাসের শেষ অবধি পর্যন্ত বৃষ্টির দেখা মিলত না। শ্রাবণ মাসেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হত না। আমন চাষীরা পানির অপেক্ষায় বসে থাকত কখন বৃষ্টি হবে? এবছর আষাঢ় মাসের প্রচুর বৃষ্টিপাত ও শ্রাবণ মাসে নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় আমন চারা রোপনের জন্য জমি গুলি পানিতে পরিপূর্ণ। উঁচু জমি গুলোতে যথেষ্ট পানি থাকায় এবার কৃষক ভাইয়েরা এক প্রকার নিশ্চিন্তে চাষাবাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর পূর্বে আমন মৌসুমে ষাঁড়/বলদের লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করা হত। চারদিকে শুধু শোনা যেত তিথি, তিথি, ব:, ব:, এঁড়, এঁড় কৃষকদের গলায় গানের সুর হৈ হুল্লোড় মিলে মনে এক আনন্দময় ছন্দের আমেজ তৈরি হত। ছোট বেলায় আমরা বিলে কর্মরত কৃষি শ্রমিকদের জন্য সকালে পান্তাভাত নিয়ে যেতাম। আইলের ধারে বসে যখন তৃপ্তি সহকারে আহার করতেন তখন আমরা অবাক নয়নে থাকতাম। সে সব সুখময় দৃশ্য আজ শুধু স্মৃতি। কারণ এখন শুনা যায় ট্রাক্টরের গুঁড় গুঁড় আওয়াজ যেন যুদ্ধকালীন ট্যাংক চলছে। এক ঘেঁয়ে বিরক্তিকর শব্দ গুলো কৃষকের মনে কোন আনন্দ জাগায় না। বরঞ্চ মনে অজানা আশংকা ভিড় করে।
প্রান্তিক কৃষক শফি ভাই ও হাফেজ ভাই জানালেন এ বছর সাদা সারের মূল্য গত বছরের তুলনায় ১৫-২০ টাকা বেশী। অন্যান্য সারেরও দাম বেশী। ট্রাক্টর ভাড়া গত বছর ছিল প্রতি কানি (৪০ শতক) ২৪০০-২৫০০/- টাকা। এবছর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতি কানি চাষের খরচ নেয়া হচ্ছে ৩,০০০ টাকা করে। একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরী ভাতসহ ৯০০-১০০০ টাকা সব মিলিয়ে প্রতি কানি জমির আমন চাষে ধান কাটা ও তোলা পর্যন্ত প্রায় তিন/চার হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে।
দুঃখ ভরা মন নিয়ে আরো জানান গত মৌসুমে আড়ি প্রতি (১০) ধানের দাম ছিল ২৮০-৩০০ টাকা। কিন্তু এখন তা ২৫০ টাকায় নেমে এসেছে। প্রান্তিক কৃষক আজাদ বলল সে কিছু ধান রেখে দিয়েছিল এসময় বিক্রি করে চাষের খরচ মিঠাবে। কারণ এসময় ধানের দাম কিছুটা বেশি থাকে।
ধানের দাম কমে যাওয়ায় এখন মাথায় হাত। তাই কারো মনে আগ্রহ বা খুশি নেই। সরকার যদি ধানের দামের ব্যাপারে গঠনমূলক সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে উৎপাদন খরচও উঠবে না। এই আশংকা নিয়ে চাষ চলছে। গত বোরো মৌসুমে কর্ণফুলী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলার অধিকাংশ জমি বলতে গেলে কোন বিলে বোরো ধানের চাষ হয় নাই।
বিগত সময়ে দেখা যেত চৈত্র মাসের শেষে বা বৈশাখ মাসের শুরুতে মাঝে মধ্যে খালে লবণ পানি আসত। কিন্তু এখন গত দুই বছর থেকে ফাল্গুন মাস থেকে লবণ পানি আসা শুরু হয়। গত ৩য় বছর থেকে লবণ পানিতে বোরো ধান নষ্ট হওয়ায় গত বোরো মৌসুমে বিরাট বিরাট বিল গুলি খালি রয়ে গিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত না অন্য কিছু তা নিয়ে অবিলম্বে বিজ্ঞানীদের ভাবতে হবে। যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা পূর্বক বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান করতে হবে।
গত ২৩-০৭-২০২৬ সালে জাতীয় ‘‘দৈনিক সমকাল ও দৈনিক কালার কন্ঠে’’ প্রকাশিত জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি শীর্ষক সংবাদে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সার সংকটের কারণে আগামী বছর বাংলাদেশের
প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার তীব্র সংকটে পড়তে পাড়ে এবং ইতিমধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে।
ভয়াবহ ‘‘অশনি সংকেত’’ সময় থাকতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বাত্মক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে সময়ের একফোঁড় অসময়ে দশফোঁড়। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারা যায় না, দেশের কৃষক ও প্রান্তিক কৃষকেরা যেমন, মর্যাদাহীন তেমনি চিরবঞ্চনার শিকার। প্রায়শ্চ কৃষকেরা অভিযোগ করে থাকেন সারের জন্য দেওয়া ভর্তুকি শেষ পর্যন্ত কৃষকদের হাতে পৌঁছে না।
সরকারিভাবে প্রদত্ত ট্রাক্টরের সাশ্রয়ী ভাড়ার সুযোগও কৃষকেরা পান না। যার নামে ট্রাক্টর বরাদ্ধ দেওয়া হয়, সে কৃষকদের থেকে অতিরিক্ত হারে ভাড়া আদায় করে থাকে। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের কঠোর তদারকি প্রয়োজন। কথিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে কৃষিখাতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখুন আমেরিকার সরকার কৃষকদের ৫০% পর্যন্ত ভর্তূকি দিয়ে থাকে। অথচ তাদের পরিচালিত বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আমাদের পরামর্শ দেয় ভূর্তকি বন্ধ করতে হবে। তাদের দেশের উৎপাদিত কৃষি পণ্য উপকরণ, বীজ, সার, পশুখাদ্য, পোল্ট্রি সামগ্রী, কীটনাশক, ঔষুধ বাণিজ্য চুক্তির উসিলায় তাদের নির্ধারিত মূল্যে আমাদের আমদানি করতে হবে।
মোর্দ্দা কথা এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তুলনামূলক কম মূল্যে আমেরিকা ছাড়া অন্য কোন দেশ থেকে ঐসব পণ্য আনা যাবে না। ভেবে দেখুন কৃষক কুলের কি সর্বনাশ হতে পারে। তাই এখন থেকে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল গুলোর প্রতি আহবান জানাই আসুন আমাদের দেশের জনগণের অন্নদাতা কৃষক জনগণের স্বার্থ বিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলি এবং বাংলার কৃষিকে রক্ষা করি।
লেখক: জয়নাল আবেদীন, সভাপতি, হাইদগাঁও কৃষক কল্যাণ সমিতি, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
